বাংলা চলচ্চিত্র – ফিরে দেখা একশো বছর

 বাংলা চলচ্চিত্র – ফিরে দেখা একশো বছর

    আমাদের প্রধান শিল্পমাধ্যমগুলির মধ্যে সিনেমা বা চলচ্চিত্র হচ্ছে নবীনতম মানুষ কবে কোন গুহাকন্দরে পাথর খোদাই করে ছবি একেছিল, কিংবা কবে সে মনের আনন্দে গান গেয়েছিল  তা আমরা জানি না, জানি না কে কবে প্রথম কবিতা রচনা করেছিল । কিন্তু চলচ্চিত্রের জন্মদিন কবে তা আমরা জানি । আর জানি চলচ্চিত্র হচ্ছে সেই আশ্চর্য শিল্প যার মধ্যে সাহিত্য, সঙ্গী্ত নাট্যকলা, চিত্রকলা – সমস্ত শিল্পের সম্মিলন ঘটেছে । ১৯১৩ সালের ২১শে এপ্রিল মুক্তিপ্রাপ্ত দাদাসাহেব ফালকের নির্বাক চিত্র  ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’ কে ধরে চার বছর আগে ভারতীয় চলচ্চিত্রের শতবার্ষিকী পালিত হয়ে গেছেআর ১৯১৯ সালের ৮ই নভেম্বর মুক্তিপ্রাপ্ত ১০ রীলের কাহিনী চিত্রকে ধরা হয় প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র হিসাবে । তয়েব গত বছরে বাংলা চলচ্চিত্রের শতবর্ষ পূর্তি হয়েছে

    একটা কথা বলে রাখা ভালো যে, বাংলা বা ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনক হিসাবে কোন একজনকে চিহ্নিত করার অর্থ ইতিহাসকে অস্বীকার করা । তেমনই দাদা সাহেব ফালকেই প্রথম পূর্নাঙ্গ কাহিনী চিত্রের নির্মাতা কিন্তু তিনিই ভারতে চলচ্চিত্র শিল্পের জনক এটা ইতিহাসনির্ভর তথ্য নয় । বরং এই স্বীকৃতি প্রাপ্য ঢাকার মাণিক গঞ্জের  বাঙালি যুবক হীরালাল সেনের সেকথা বলবো, তার আগে গোড়ার কথা বলি ।

 

গোড়ার কথা

    ১৬২৪ খ্রীষ্টাব্দে এক অভিনব সূত্র আবিষ্কার করেন ইংরাজি সমার্থক শব্দকোষবা থেসারসএর সংকলক পিটার মার্ক রজেট যে, মানুষ যে কোন দৃশ্যই দেখুক তা অপসৃত হওয়া মাত্রই চোখ থেকে বিলীন হয়ে যায় না । চলচ্চিত্রের আবিষ্কার ও নির্মাণ সম্ভব হয়েছে এই মূল সূত্রের ওপর ভিত্তি করেই । স্থিরচিত্র থেকে চলমান ছবিতে পৌছানোর প্রক্রিয়ায় বহু মানুষের অনেক আবিস্কার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথ পেরিয়ে  ফ্রান্সের দুই জমজ ভাই  অগাস্ট ল্যুমিয়ের ও লুই ল্যুমিয়ের ১৮৯৬এর ২৯শে জুন প্যারিসে প্রথমসিনেমাটোগ্রাফযন্ত্রে চলমান ছবির প্রদর্শন করেছিলেন বায়োস্কোপ তখন বিশ্বের এক অত্যাশ্চর্য বস্তু আর দু বছরের মধ্যেই সেই অত্যাশ্চর্য বস্তুর নির্মাণ ও প্রদর্শনের কৃৎকৌশল আয়ত্ব করে ফেললেন ঢাকার মাণিকগঞ্জের ৩১ বছরের বাঙালি যুবক হীরালাল সেন

    প্রায় একই সময়ে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ব্যক্তির গবেষণার ফল চলচ্চিত্রের আবিষ্কার আর তা সফলভাবে প্রথম প্রদর্শনের কৃতিত্ব লুমিয়ের ভাইদের । চলচ্চিত্র বা সিনেমা নয়, তখন বলা হত বায়োস্কোপ । আমাদের শৈশব-তারুণ্যে সবাক যুগেও সিনেমাকে বায়োস্কোপনামেই জেনেছিলাম । উদ্ভাবনের ছয় মাস পরেই ভারতে চলে এলো বায়োস্কোপ । উদ্ভাবক ল্যুমিয়ের ভাইরাই মূম্বাইয়ের একটি হোটেলে চলমান ছবি প্রদর্শন করলেন । কলকাতায় বায়োস্কোপ এলো আরো পাচ মাস পরে । স্টিভেন্স নামে এক সাহেব কলকাতার স্টার থিয়েটারে নাট্যাভিনয়ের আগে তাঁর প্রজেক্টর মেশিনে চলমান ছবি দেখালেন, স্টারের নাট্যদল মফঃস্বলে অভিনয় করতে গেলে তিনিও দলের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়ে বায়োস্কোপ দেখাতে লাগলেন । স্টিভেন্সের বায়োস্কোপে ছুটন্ত ঘোড়া, চলন্ত ট্রেন, উড়ন্ত পাখী এইসব । নবতম বিনোদন বায়োস্কোপ নেহাতই সার্কাশ বা জাদুর মত মজার উপকরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে তখন ।

বায়োস্কোপের যুগ

    কিন্তু অন্য রকম ভেবেছিলেন ঢাকার মাণিকগঞ্জের এক বাঙালি যুবক হীরালাল সেন ।  স্টিভেন্সের বায়োস্কোপ দেখে নেশা ধরলো তাঁর । হীরালাল স্টার থিয়েটারে গিয়ে দেখলেন স্টিভেন্স সাহেবের বায়োস্কোপ ।  স্টিভেনস সাহেবের সঙ্গে গল্পগুজব করার ফাঁকে ছবি দেখতে দেখতেই কৃৎকৌশল আয়ত্ত করে নিলেন হীরালাল । এই সময় একটা অপ্রত্যাশিত সুযোগ চলে এলো হীরালালের সামনে । স্টিভেন্স সাহেব ছবি দেখাতে এলাহাবাদে গিয়ে দুর্ঘনায় পড়ে দেশে ফিরে যান । আর ঠিক তখনই কলকাতায় এসেছিলেন এক আমেরিকান ব্যবসায়ী তার পুরাতন প্রজেক্টর বিক্রি করার জন্য । হীরালাল কোনক্রমে টাকা জোগাড় করে পাঁচ হাজার টাকায় কিনে নিলেন সেই প্রজেক্টর ।

    কলকাতা তখন থিয়েটারের শহর । বাঙালির সেরা বিনোদন তখন থিয়েটার, আর কলকাতার নাট্যাকাশে রয়েছেন উজ্বলতম জ্যোতিষ্ক অমরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তাঁর ক্লাসিক থিয়েটারঅমরেন্দ্রনাথের সহায়তা চাইলেন হীরালাল,এবং পেলেন । অমরেন্দ্রনাথের সহায়তায় ক্লাসিক থিয়েটারে বায়োস্কোপ দেখালেন হীরালাল- মতিলাল ১৮৯৮এর ৪ঠা এপ্রিল   এইসব ছিল ছুটন্ত ঘোড়া, উড়ন্ত পাখি, চলন্ত ট্রেন ইত্যাদির চলন্ত ছবি । তাতে তো কোন গল্প নেই ! এবার হীরালাল ভাবলেন নাট্যকাহিনীর চলমান ছবি দেখানোর । বিলেত থেকে ক্যামেরা ও চলচ্চিত্র তৈরির যন্ত্রপাতি আনালেন । ক্লাসিক থিয়েটারে অভিনীত একের পর এক নাটকের দৃশ্যাবলী ধরে রাখলেন সেলুলয়েডে । আলিবাবা’, ‘সীতারাম’, ‘ভ্রমর’, ‘মৃণালিনী’, ‘বুদ্ধদেব’, ‘দোললীলাপ্রভৃতি মঞ্চসফল নাটকের দৃশ্য ফিল্মে ধরে রাখলেননাটকের দৃশ্য ছাড়াও হীরালাল তাঁর বায়োস্কোপে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের মিছিলের দৃশ্যও চলচ্চিত্রায়িত করেছিলেন, তুলেছিলেন বিজ্ঞাপন চিত্র ও চিৎপুর রোড নিয়ে একটি তথ্যচিত্র ।  অর্থাৎ শুধু চলচ্চিত্রই নয়,হীরালাল সেন ভারতের তথ্যচিত্র ও বিজ্ঞাপনচিত্রেরও জনক । ১৯০৩এ ক্লাসিক থিয়েটারের আলিবাবানাটকটির সম্পূর্ণ চলচ্চিত্রায়িত করেন হীরালাল, মর্জিনার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সেকালের তারকা অভিনেত্রী কুসুমকুমারী । অতয়েব কুসুমকুমারীই এদেশের প্রথম চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ।

 ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের জনক - হীরালাল সেন

    কোন প্রশ্নোত্তরী বা কুইজের আসরে ভারতের চলচ্চিত্রশিল্পের জনক কে?’ এমন প্রশ্ন করলে অবধারিত উত্তর আসবে দাদাসাহেব ফালকের নাম । সঞ্চালকও হয়তো উত্তরটাকে সঠিক বলে দেবেন । এদেশে এমনই হয় ! মিথ্যা বা অর্ধসত্যকেই সত্য বলে প্রতিপন্ন করার সচেতন প্রয়াস হয় প্রভাবশালী মহলের দ্বারা । তাঁরা দাদাসাহেব ফালকেকেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনক বলে প্রচার করেন । ফালকের তোলা প্রথম চলচ্চিত্র রাজা হরিশচন্দ্রএখনও সংরক্ষিত আছে আর হীরালালের তোলা সমস্ত চলচ্চিত্র ও তাঁর স্টুডিও বিধ্বংসি আগুনে ভস্মিভূত হয়ে যায় । কিন্তু ইতিহাস কোথাও না কোথাও সত্যকে লিখে রাখে । তাই পরবর্তী গবেষণায় এখন এটা প্রমাণিত সত্য যে, দাদাসাহেব ফালকে নয় হীরালাল সেনই উপমহাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের জনক । ফালকের নামে সিনেমাশিল্পের সর্বোচ্চ সম্মাননা দেওয়া হয় কিন্তু হীরালাল সেনের নামে খাস কলকাতায় একটা রাস্তারও নামকরণ হয়নি । শুনেছি ঢাকাতে তাঁর নামে একটি রাস্তা আছে । সেখানে ফেডারেশন অফ ফিল্ম সোসাইটিজ অফ বাংলাদেশপ্রতি বছর হীরালাল সেন স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করেন । তারা মনে রেখেছেন উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের জনককে, এদেশে আমরা রাখিনি ।

    সত্য বটে, ১৯১৩তে রাজা হরিশ্চন্দ্রনামে দাদা সাহেব ফালকে যে  কাহিনীচিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন সেটাই দেশের প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র, কিন্তু প্রথম চলচ্চিত্র নয় । ফালকের রাজা হরিশ্চন্দ্রমুক্তি পেয়েছিল ১৯১৩র মে মাসে আর তার অনেক আগে ষোল বছর আগে অবিভক্ত বাংলার মানিকগঞ্জ জেলার বগজুরি গ্রামের এক যুবক হীরালাল সেন ইংলন্ড থেকে যন্ত্রপাতি এনে চলমান ছবি বানিয়েছিলেন । বলা যায় হীরালাল সেন যেখানে শেষ করেছিলেন দাদাসাহেব ফালকে শুরু করেছিলেন সেখান থেকেই । ফালকের রাজা হরিশচন্দ্রের আগে ১৮৯৭ থেকে ১৯১৩র মধ্যে হীরালাল নির্মাণ ও প্রদর্শণ করেছিলেন চল্লিশটি চলমান ছবি (থিয়েটারের দৃশ্য, বিজ্ঞাপন চিত্র ও দলিল চিত্র বা ডকুমেন্টারি) এবং তাঁর চলচ্চিত্র প্রদর্শণের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রয়াল বায়োস্কোপ কোম্পানি

    ১৯১৩ নাগাদ পার্শি ব্যবসায়ী জামসেদজি ফ্রামজি ম্যাডনের ম্যাডান কোম্পানী কলকাতায় চলচ্চিত্র নির্মাণ ব্যবসায়ে নামলেন । কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় বেশি দূর এগোতে পারলেন না । তারাই প্রথম বাংলা কাহিনীচিত্র ‘বিল্বমঙ্গল’ নির্মাণ করলেন ১৯১৯এ  নির্বাক ছবি, তাই ভাষার বালাই নেই, দু একজন ছাড়া অভিনেতা অভিনেত্রীরাও ছিল অবাঙালি । তখন সেলুলয়েড ফিল্মের শরীরে শব্দ ধারণে কৃৎকৌশল জানা ছিল না । বিশ্বের অন্যত্রও ছিল নির্বাক সিনেমার যুগ । এই সময়েই নির্মিত হয়েছিল বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ‘ব্যাটেলশিপ পোটেমকিন’ (১৯২৫) নির্বাক যুগে শ’দেড়েক সিনেমা তৈরি হয়েছিল, একশো বছর পরে বায়োস্কোপের উদ্ভব থেকে  নির্বাক সিনেমা যুগের কোন চিহ্নমাত্র আজ আর নেই, আছে শুধু ইতিহাসের পাতায় আর চলচ্চিত্র গবেষকদের গবেষণা পত্রে ও স্মৃতিচারণায় । একটি ছবিও সংরক্ষিত হয়নি । কথা না-বলা সিনেমা যুগের যে চারটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার কথা না জানলে একশো বছরের বাংলা সিনেমার ইতিহাসকে ফিরে দেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, তা হল (১) নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ীর চলচ্চিত্রে যোগদান (২) বাংলা সাহিত্যের সিনেমার আশ্রয় হয়ে ওঠা এবং (৩) দুই কর্মপুরুষ ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ও বীরেন্দ্রনাথ সরকারের চলচ্চিত্র শিল্পে যোগদান ও নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওর স্থাপনা

    ১৯২২এর আগে বাংলার সুধীসমাজ ও সাংস্কৃতিক জগতকে বাংলা সিনেমা আকৃষ্ট করতে পারেনি । ইতিমধ্যে বিশাল অর্থ বিনিয়োগ করে থিয়েটার ব্যবসায়ে নামল ম্যাডান কোম্পানী । তারাই ১৯২২এ শিশিরকুমারকে সিনেমায় টেনে আনল । সিনেমায় শিশিরকুমারের অভিনয় ও পরিচালনা সে যুগের সিনেমাকে কিছুমাত্র প্রভাবিত করেছিল ইতিহাস এমন সাক্ষ্য দেয়না । কিন্তু তাঁর যোগদানের ফলে বাংলা সিনেমা সুধী সমাজের কাছে মর্যাদা আদায় করতে পেরেছিল । থিয়েটার থেকে অনেকেই এলেন সিনেমার অভিনয় ও পরিচালনায় । সবচেয়ে বড় যে কাজটি তিনি করেছিলেন তা হ’ল সিনেমাকে সাহিত্যনির্ভর করে তোলা । সেই নির্বাক যুগেই সিনেমায় এলো শরৎ, বঙ্কিম, রবীন্দ্রসাহিত্য  ১৯২২এ শিশিরকুমার নির্মাণ করলেন শরৎচন্দ্রের ‘আঁধারে আলো’, ১৯২৩এ নরেশ মিত্র করলেন রবীন্দ্রনাথের ‘মানভঞ্জন’, ১৯২৬এ বঙ্কিমচন্দ্রেরর ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ পরের নব্বই বছর বাঙালিকে প্রেক্ষাগৃহে টেনে এনেছে সাহিত্যরস সমৃদ্ধ গল্প

শৈশবের অভিভাবক – ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলী

    বাংলা সিনেমার শৈশবে এমন দুজন মানুষ বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পে ঝাপিয়ে পড়লেন বাংলা সিনেমাশিল্পের বেড়ে ওঠায় যাদের অসামান্য অবদান চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্গে জড়িত সকলেই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তারা হলেন ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় বা ডিজি এবং বীরেন্দ্রনাথ সরকার ।

    নিজামের হায়দরাবাদ আর্ট স্কুলের মর্যাদাময় অধ্যক্ষের পদ ছেড়ে দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন চলচ্চিত্র শিল্পে,গড়ে তোলেনদি ইন্দো বৃটিশ ফিল্ম কোম্পানী১৯১৮তে ধীরেন্দ্রনাথ ছিলেন অভিজাত বংশের সন্তান রবীন্দ্রনাথের কন্যা মীরা ছিলেন তাঁর বৌদি অর্থাৎ দাদার স্ত্রী নির্বাক যুগ থেকে নভেম্বর ১৯৭৮এ মৃত্যু পর্যন্ত ডিজি ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের সর্বজন শ্রদ্ধেয় মানুষ ধীরেন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন চলচ্চিত্রকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে,গিয়েও ছিলেন ধীরেন্দ্রনাথের মানস গড়ে উঠেছিল শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে ওখান থেকেই এন্ট্রান্স পাশ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অভিনয়ও করেছিলেন লন্ডন আর্ট স্কুলের পাঠ শেষ করে নিজামের হায়দরাবাদ আর্ট স্কুলে অধ্যক্ষর পদে যোগ দিয়েছিলেন তারপর সব ছেড়ে চলচ্চিত্রের মায়াবী ডাকে চলে এলেন কলকাতায়,গড়ে তুললেনইন্দো-ব্রিটিশ ফিল্ম কোম্পানী ধীরেন্দ্রনাথ অনুভব করেছিলেন যে, সম্পূর্ণভাবে বাঙালিদের অংশগ্রহণ ভিন্ন বাংলা সিনেমাশিল্পের বিকাশ সম্ভব নয় ধীরেন্দ্রনাথের বিরাট অবদান চলচ্চিত্রে বাঙালির প্রভাব বিস্তার বস্তুত তার সংস্থা বাংলা সিনেমার নির্মাণে উদ্যোগ নেওয়ার ফলেই বাংলা চলচ্চিত্রে ম্যাডানদের একাধিপত্য স্তিমিত হতে শুরু করে এবং চলচ্চিত্রের সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বাঙালি আধিপত্য বিস্তারের সূচনা হয় ধীরেন্দ্রনাথই ছিলেন প্রথম বাঙালি প্রযোজক এবং সম্পূর্ণ বাঙালি শিল্পী ও কলাকুশলীদের নিয়ে নির্মিত পূর্ণাঙ্গ বাংলা সিনেমার জনক 

       আধুনিক মননের মানুষ ধীরেন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন চলচ্চিত্রের অভিনয়ে মেয়েরা আসুক,বুঝেছিলেন বিদেশিনী মেয়েদের দিয়ে অভিনয় করিয়ে বাংলা সিনেমা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারবে না তখন ম্যাডানদের বাংলা সিনেমায় স্ত্রী চরিত্রে অভিনয় করতেন এংলো ইন্ডিয়ান অভিনেত্রী পেসেন্স কুপার, আলবার্টিনা, সিলভিয়া বেল প্রমুখ বাঙালি অভিনেত্রী সংগ্রহের জন্য ধীরেন্দ্রনাথ সোনাগাছির নিষিদ্ধ পল্লীতে ঘুরেছেন, নিজের বন্ধুদের কাছে আবেদন করেছেন সেকালে এটা খুব সহজ ছিল না সামাজিক নিষেধকে অগ্রাহ্য করা,যার জন্য অপবাদও কম সইতে হয়নি তাঁকে এটা তাঁর কথার কথা ছিল না নিজের স্ত্রী প্রেমলতিকা দেবী ও কন্যা মনিকাকে সিনেমায় নামিয়েছিলেন সামাজিক নিষেধের বেড়া অগ্রাহ্য করে প্রথম ছবিবিলা্ত ফেরতএ প্রখ্যাত এডভোকেট বিধুভূষণ মুখার্জীর মেয়েকে নায়িকার ভুমিকায় নামিয়ে অসাধ্য সাধন করেছিলেন ।

       বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের বেড়ে ওঠায় অসামান্য অবদান ছিল ধীরেন্দ্রনাথের দুই প্রবাদপ্রতীম চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব প্রমথেশ বড়ুয়া ও দেবকী কুমার বসু তাঁর হাত ধরেই সিনেমায় এসেছিলেন তাঁর সময় থেকে বিত্তবান বাঙালি ব্যবসায়ীয়াও চলচ্চিত্রশিল্প সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এই সময়ে নির্মিত হয় বাঙালি ব্যসায়ীয় উদ্যোগে ভবাণীপুরে রসা থিয়েটার এখন যার নামপূর্ণচিত্রগৃহ এখানেই ধীরেন্দ্রনাথের প্রথম সিনমাবিলেত ফেরতমুক্তি পায় ১৯২১এর ২৬শে ফেব্রুয়ারি বড় মাপের অভিনেতা ছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ   

    আর একজনের কথা না বললে বাংলা সিনেমার কথা অসম্পূর্ণ থেকে যায় । বাংলা সিনেমাশিল্প অনেকটা পথ পেরিয়ে সাবালক হওয়ার পথে এগিয়েছে । এই সময় সিনেমাশিল্পের বিপুল ব্যবসায়িক সম্ভাবনার কথা বুঝতে পেরে বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হলেন এক ব্যক্তিত্বপূর্ণ কর্মপুরুষ, যিনি বাংলা সিনেমার চলচ্চিত্রায়ন, প্রদর্শন ও বিপণনের ক্ষেত্রে প্রবল ভূমিকা নিলেন । তিনি বীরেন্দ্রনাথ সরকার ।

    চলচ্চিত্রশিল্পের প্রতি বাঙালির আগ্রহ বেড়েছিল, চলচ্চিত্র নির্মাণের সংখ্যাও বাড়ছিল, কিন্তু ছবির প্রদর্শনের জন্য প্রেক্ষাগৃহ সবই ম্যাডানদের দখলে, একমাত্র পূর্ণ থিয়েটার ছাড়া আধুনিক স্টুডিও গড়ে ওঠেনি তখনও সিনেমার সুটিং হত থিয়েটার হল’এ কিংবা কোন বাগানবাড়িতে এই সময় লন্ডন থেকে সিভিল ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে সে যুগের প্রখ্যাত ব্যারিষ্টার স্যার নৃপেন্দ্রনাথ সরকারের পুত্র বীরেন্দ্রনাথ সরকার কলকাতায় ফিরে চলচ্চিত্র সম্পর্কে আগ্রহী হলেন বীরেন্দ্রনাথ তাঁর দুই বন্ধুর সঙ্গে মিলে বানালেন ‘ইন্টারন্যাশানাল ফিল্ম ক্রাফট’ সংস্থা তাঁরা প্রথমেই নির্মাণ করলেন ‘চিত্রা’নামে একটি চিত্রগৃহ, যার দ্বারোদ্ঘাটন করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩০এর ২৯শে ডিসেম্বর চলচ্চিত্রশিল্পে বিরাট কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বীরেন্দ্রনাথ কলকাতা, বর্ধমান ও হাওড়ায় মোট ৬টি প্রেক্ষাগৃহের নির্মাণ করেন বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে বীরেন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ অবদান ‘নিউ থিয়েটার্স’ স্টুডিওর নির্মাণ ও পরিচালনা ১৯৩০এর ১৯শে সেপ্টেম্বর পথ চলা শুরু করে নিউ থিয়েটার্স, সেই থেকে আজও প্রায় শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের প্রাণকেন্দ্র হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আর শুধু বাংলা ছবিই বা কেন এক সময়ে হিন্দি ছবির নির্মাণও এখান থেকেই হত, আর কলকাতা ছিল হিন্দি ছবি নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রপ্রাথমিক যুগের বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটিয়ে চলচ্চিত্রায়ন, ছবির প্রদর্শন ও বিপণনে সিনেমাকে একটা শৃঙ্খলায় বাঁধতে চেয়েছিলেন বীরেন্দ্রনাথ, এবং পেরেওছিলেন ।

বাংলা সিনেমা সবাক হল

        এদিকে নিঃশব্দে সিনেমায় কথা ফোটানোর কৃৎকৌশল চলে এসেছে । ১৯২৮এ আমেরিকায় মুক্তি পেয়েছে প্রথম পূর্নাঙ্গ সবাক চিত্র ওয়ার্নার ব্রাদার্সের ‘লাইটস অফ নিউইয়র্ক’ । ভারতে প্রথম পূর্ণাঙ্গ সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেন আরদেশির ইরাণী - ‘আলম-আরা’ । ১৯৩১এর ১৪ই মে মুক্তি পেল ছবিটি । আর ঐ একই বছরে ২৭শে জুন তখনকার ক্রাউন থিয়েটারে (এখন উত্তরা ) মুক্তি পেল প্রথম কথা-বলা বাংলা সিনেমা ‘জোর বরাত’ । বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের উররন ঘটলো নির্বাক থেকে সবাক যুগে ।

    ১৯২৮এ আমেরিকায় মুক্তি পেয়েছে প্রথম পূর্নাঙ্গ সবাক চিত্র ওয়ার্নার ব্রাদার্সের ‘লাইটস অফ নিউইয়র্ক’ ভারতে প্রথম পূর্ণাঙ্গ সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেন আরদেশির ইরাণী - ‘আলম-আরা’ ১৯৩১এর ১৪ই মে মুক্তি পেল ছবিটি । আর ঐ একই বছরে ২৭শে জুন তখনকার ক্রাউন থিয়েটারে (এখন উত্তরা ) মুক্তি পেল প্রথম কথা-বলা বাংলা সিনেমা ‘জোর বরাত’ সবাক বাংলা সিনেমার আগমনের একটা ছবি পাবো সে যুগের প্রখ্যাত অভিনেতা অহীন্দ্র চৌধুরীর বয়ানে । “এই সময় সিনেমা-জগতে এল এক বিরাট বিপ্লব । বায়োস্কোপে কথা বলা বা ‘টকি’র যুগ । তখনকার দিনে কয়েকটি ইংরেজি চিত্রগৃহে ‘কথা-বলা’ ছবি দেখানো হতে লাগল । ভারতে প্রথম টকি ফিল্ম তৈরি করলেন বোম্বাইএর ইম্পিরিয়াল ফিল্ম কোম্পানি । বাংলার প্রথম টকির মেসিনপত্র আনালেন ম্যাডান কোম্পানিএক্সপেরিমেন্ট হিসাবে প্রথমে ছোট ছোট টকি শট তোলা হল নাটকের বিশেষ বিশেষ দৃশ্য বা নাচ-গান নিয়ে । এইসব নির্বাচিত দৃশ্য তুলে জনসাধারণকে দেখানো হতে লাগল” (নিজেরে হারায়ে খুঁজি / অহীন্দ্র চৌধুরী – ২য় পর্ব) চলচ্চিত্রের ‘টকি’ হয়ে ওঠা নিশ্চিতভাবেই ছিল এক মাইলস্টোনের স্থাপনা । বিশ্ব সিনেমায় সেলুলয়েডে শব্দধারণের কৃৎকৌশল উদ্ভাবনের তিন বছরের মধ্যে বাংলা সিলেমা সেই প্রযুক্তি আত্মস্থ করে নিতে পেরেছিল । নির্বাক ছবির অভিনেতা-অভিনেত্রীরা নতুন যুগের সবাক অভিনয় ধারা আয়ত্ব করে নিলেন । সেটা খুব সহজ কাজ ছিল না । প্রথম সবাক ছবি ‘জোর বরাত’এর নায়িকা কানন দেবী – যিনি পরবর্তী কালে হয়ে উঠেছিলেন বাংলা সিনেমার প্রথম সুপার স্টার বা মহানায়িকা, সেদিনের স্মৃতিচারণ করেছেন এইভাবে “কত বিখ্যাত শিল্পী নির্বাক যুগে রীতিমত নাম করেছিলেন, ‘সাউন্ড টেস্টের’ দৌরাত্মে তাদের ছবিতে কাজ করা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল” (‘সবারে আমি নমি’/ কানন দেবী) । সিনেমায় কথা ফোটার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সিনেমাশিল্প সাবালকত্বে পৌছালো, সিনেমার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়লো । সিনেমায় সঙ্গীত সংযোজনের সঙ্গে সঙ্গে সিনেমার প্রতি মানুষের আকর্ষণ দারুণভাবে বৃদ্ধি পেল । ইতিমধ্যে উঠে এসেছেন দেবকীকুমার বসু, প্রমথেশ বড়ুয়ার মত চিত্র পরিচালক, কানন দেবী, কুন্দললাল সায়গল, জহর গাঙ্গুলী, পাহাড়ি সান্যাল, ছবি বিশ্বাস, তুলসী চক্রবর্তী, ছায়া দেবী, মলিনা দেবী প্রমুখের মত অভিনেতা-পভিনেত্রী, সিনেমার সঙ্গীত পরিচালনায় এসেছেন কৃষ্ণচন্দ্র দে, পঙ্কজকুমার মল্লিক, রাইচাঁদ বড়াল প্রমুখ ।

এলো সাবালকত্বের ছোঁয়া

    বস্তুত বাংলা সিনেমার নির্মাণে সাবালকত্বের ছোঁয়া লাগলো নিউ থিয়েটার্সের আধুনিক ও উন্নততর ব্যবস্থাপনায় । বাংলা সিনেমা মানেই তখন নিউ থিয়েটার্স আর তার নেপথ্যের প্রাণপুরুষ বীরেন্দ্রনাথ। সেকালের প্রথিতযশা অভিনেত্রী কানন দেবী বীরেন্দ্রনাথের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন “... এই নীরব মানুষটি যে শিল্প ও শিল্পীর অকৃত্রিম পূজারী এবং ভারতে চলচ্চিত্রশিল্পের অগ্রগতিকে ইনি একাই একশ বছর এগিয়ে দিয়েছেন সে যুগের শ্রেষ্ঠ শিল্পী, সুরকা্র‌ গীতিকার,পরিচালকদের তাঁর পতাকাতলে একত্র করে এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই । এ অবদানের ক্ষেত্রে বাঙালি মাত্রেই ঋণী । জগতের রসিক দরবারে আজ ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই সম্মান ও স্বীকৃতি হয়তো স্বপ্নই থেকে যেত যদি না বি এন সরকারের মত মানুষ এই কাজে এগিয়ে এসে আনুকুল্যের হাল ধরতেন” । (‘সবারে আমি নমি’ / কানন দেবী ) । দেবকী বসু, প্রমথেশ বড়ুয়া, কানন দেবী, সায়গল, পঙ্কজ মল্লিক, রাইচাদ বড়াল, কৃষ্ণচন্দ্র দে, পৃথ্বিরাজ কাপুর, দুর্গা খোটে, ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ী সান্যাল, তুলসী চক্রবর্তী প্রমুখ কত স্মরণীয় শিল্পীর উত্থ্বান হয়েছে নিউ থিয়েটার্স থেকে তার ইয়ত্তা নেই । বাংলা চলচ্চিত্রের নির্মাণ ও বিকাশে ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলীর সঙ্গে একই মর্যাদায় উচ্চারিত হয় বীরেন্দ্রনাথ সরকারের নাম

    গত শতকের ত্রিশের দশকে বাংলা চলচ্চিত্র সাবালক হল । ১০৩০এ প্রতিষ্ঠা হল চলচ্চিত্রায়নের আধুনিক বন্দোবস্তের নিউ থিয়েটার্স স্টুডিও, ১৯৩১এ ২৭শে জুন বাংলা চলচ্চিত্র সবাক হল, ১৯৩৫এ বাংলা চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথের গানের প্রয়োগ হল, ১৯৩৫এই চলচ্চিত্রে সঙ্গীত প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্লেব্যাক প্রথার প্রবর্তন করলেন রাইচাঁদ বড়াল ‘ভাগ্যচক্র’ ছবিতে, আর এই ত্রিশের দশকেই বাংলা চলচ্চিত্রে এলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি তার সতেরো বছরের চলচ্চিত্র জীবনে অসামান্য নৈপুন্য ও দক্ষতার জন্য বাংলা চলচ্চিত্রের যুগ প্রবর্তকের মর্যাদা পেলেন । তিনি অসমের গৌরিবাডি রাজ পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান কুমার প্রমথেশচন্দ্র বড়ুয়া ।

    প্রমথেশ বড়ুয়া বাংলা চলচ্চিত্রে প্রবেশ করলেন ১৯৩০এ নির্বাক ছবি ‘পঞ্চশর’এ অভিনয়ের । ১৯৩৩এ যোগ দেন নিউ থিয়েটার্সে, সেখানে তখন যেন চাঁদের হাট – পঙ্কজ মল্লিক, রাইচাঁদ বড়াল, কুন্দনলাল সায়গল, কানন দেবী প্রমুখ নিজ নিজ ক্ষেত্রের উজ্বল তারকারা । প্রমথেশ শুধু অভিনেতাই ছিলেন না, অভিনয় ছাড়াও তিনি ছিলেন একাধারে পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, আলোকচিত্রী, কখনোবা সঙ্গীতকারও । প্রমথেশ বাংলা চলচ্চিত্রে আধুনিকতার ছোঁয়া নিয়েএলেন । সে যুগের খ্যাতকীর্তি অভিনেত্রী কানন দেবীর কথায় “... শিল্পী বড়ুয়া কোনদিন ডিরেক্টর বড়ুয়াকে ছাপিয়ে যেতে পারেননি ...ডিরেক্টর হিসাবে মিঃ বড়ুয়া সে যুগেই অনেক কিছুরই প্রবর্তক, যে ধারায় আজকের যুগের চিত্রজগতৎ চলছে । যেমন স্টেজ ঘেঁষা কথা বলার ধরনকে পরিহার করে ন্যাচারালভাবে কথা বলা, চালচলনকে দৈনন্দিন জীবনাভ্যস্ত চলাফেরার ঢঙে নিয়ে আসা । ... তারপর ক্যামেরার কাজ ও অন্যান্য টেকনিকে ওঁর একটা অগ্রগামী দৃষ্টিভঙ্গী তো ছিলই । বাংলা ফিল্মের মোড় উনিই অনেকটা ঘুরিয়েছেন বলা চলে” । (‘সবারে আমি নমি’ / কাননদেবী)

    ১৯৩৩এ প্রমথেশ নিউ থিয়েটার্সে যোগ দিয়ে নির্মাণ করেন শরৎ কাহিনীর ‘দেবদাস’ যে ছবি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের এক মাইলফলক রূপে চিহ্নিত হয়ে আছে । শুধু শরৎচন্দ্রের সংবেদনশীল কাহিনীর জন্যই নয়, দর্শকরা দেখলেন সিনেমার ভাষার সার্থক প্রয়োগ, ক্যামেরার নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, ক্লোজ-আপ, মন্তাজ । প্রমথেশের এই সাড়া জাগান ছবিটির সর্বাধিকবার পুনর্নিমান হয়েছে বাংলা ও হিন্দিতে । প্রমথেশ থেকে উত্তম কুমার, সায়গল থেকে শাহরুখ খান দেবদাসের চরিত্রায়ন করেছেন, কিন্তু এদের কেউই অভিনেতা প্রমথেশকে ছাপিয়ে গেছেন এমন কথা চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞরা বলেননি । স্বল্পায়ু প্রমথেশের সতের বছরের চলচ্চিত্র জীবনে, মোট ২১টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন । দেবদাস, রজত জয়ন্তী, গৃহদাহ, অধিকার, মুক্তি, শেষ উত্তর, মায়া ও অন্যান্য ছবিগুলির জন্য ভাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করেছিলেন তিনি ।                                                                                                                      

    সমকালেই আর এক চিত্র নির্মাতা বাংলা চলচ্চিত্রে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন । তিনি দেবকী কুমার বসু । প্রমথেশ বড়ুয়া অভিনীত প্রথম ছবি ‘পঞ্চশর’এর (১৯৩০) চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক ছিলেন । আগে সূর্যের আলোয় চলচ্চিত্রের সুটিং হত । দেবকী কুমার প্রথম স্টূডিওর ফ্লোরে কৃত্তিম আলোর ব্যবহার করা শুরু করলেন প্রমথেশ অভিনীত ‘অপরাধী’ চলচ্চিত্রে (১৯৩০) । বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকা বহু চলচ্চিত্রের নির্মাতা ছিলেন দেবকী কুমার যেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি, সীতা , সাপুড়ে, নর্তকী, রত্নদীপ, কবি, চন্দ্রশেখর, সাগর সঙ্গমে প্রভৃতি । ১৯৩৪এ তার পরিচালিত হিন্দি ছবি ‘সীতা’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয় । দেবকীকুমারই প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা যিনি কোন আন্তর্জাতিক পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন ।

    বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের একশো বছরের পথচলায় বহু চিত্রনির্মাতা, শিল্পী ও কলাকুশলী সিনেমাকে ভালোবেসে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, যায়গা করে নিয়েছেন ইতিহাসের পৃষ্ঠায় । চলচ্চিত্রের গোড়াপত্তনকালে নানা প্রতিকুলতার মধ্যে তারা কাজ করেছেন । উন্নততর প্রযুক্তির সাহায্য তাঁরা পাননি, তার মধ্যেই চলচ্চিত্রশিল্পকে সমৃদ্ধ করেছেন । চলচ্চিত্রের গোড়াপত্তনের যুগে এসেছিলেন চিত্রনির্মাতা জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়, নীতিন বসু অভিনেতা অহীন্দ্র চৌধুরী, কৃষ্ণচন্দ্র দে, কানন দেবী, সন্তোষ সিংহ প্রমুখ । সবাক যুগের এরা অনেকদিন চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন । তারপর ত্রিশের দশকে চলচ্চিত্র যখন কথা বলতে শিখলো তখন এলেন – চন্দ্রাবতী দেবী (১৯৩০), মলিনা দেবী (১৯৩১), জহর গাঙ্গুলী (১৯৩১), তুলসী চক্রবর্তী (১৯৩২), পাহাড়ী সান্যাল (১৯৩২), রাজলক্ষী দেবী (১৯৩২),জীবেন বসু (১৯৩২), ছবি বিশ্বাস (১৯৩৬), ছায়া দেবী (১৯৩৬), কানু বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৩৭), রবীন মজুমদার (১৯৩৮), সন্ধ্যারাণী (১৯৩৮), নীতিশ মুখোপাধ্যায় (১৯৩৯), পদ্মা দেবী (১৮৪০), ভারতী দেবী (১৯৪০),  অসিতবরন (১৯৪১), গীতা দে (১৯৪৩), হরিধন মুখোপাধ্যায় (১৯৪৩),রাধামোহন ভট্টাচার্য (১৯৪৪),  অনুপকুমার (১৯৪৬), বিকাশ রায় (১৯৪৭), জহর রায় (১৯৪৭), প্রদীপকুমার (১৯৪৭), কালী বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৪৭), ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৪৮), উত্তম কুমার (১৯৪৮), অনুভা গুপ্তা (১৯৪৮), বঙ্কিম ঘোষ (১৯৪৮) সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৪৮),হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৪৮), শোভা সেন (১৯৪৯),সুখেন দাস (১৯৪৯), মাধবী মুখোপাধ্যায় (১৯৪৯), উৎপল দত্ত (১৯৫০), রুমা গুহ ঠাকুরতা (১৯৫০),গঙ্গাপদ বসু (১৯৫০), মঞ্জু দে (১৯৫১), বসন্ত চৌধুরী (১৯৫২), সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় (১৯৫২), সুপ্রিয়া চৌধুরী (১৯৫২), অরুন্ধতী দেবী (১৯৫২), জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায় (১৯৫২),  অনিল চট্টোপাধ্যায় (১৯৫৩), নির্মল কুমার (১৯৫৩), মালা সিনহা(১৯৫৩),প্রেমাংশু বসু (১৯৫৩), সুচিত্রা সেন (১৯৫৩), দিলীপ রায় (১৯৫৪), তরুণ কুমার (১৯৫৫), সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, শর্মিলা ঠাকুর (১৯৫৯), রবি ঘোষ (১৯৫৯) । সীমিত পরিসরে অনেককেই ছোঁয়া গেল না, কিন্তু মোটামুটি এরাই পঞ্চাশ ষাট- সত্তরে বাংলা সিনেমার স্বর্ণ সময়ের নির্মাণ করেছিলেন, সঙ্গে ষাট দশকের নবাগতারা অপর্ণা সেন (১৯৬১), লিলি চক্রবর্তী (১৯৬৩) প্রমুখেরা ।

 

বাংলা সিনেমার স্বর্ণসময়

    স্বাধীনতা-উত্তর সময়কালে পঞ্চাশ থেকে আশি এই তিন দশকে বাংলা চলচ্চিত্রের যে ‘ঐশ্বর্য-সময়’ তার  প্রস্তুতি পর্ব বলা চলে চল্লিশের দশকটিকে । পঞ্চাশের দশকে মূলস্রোতের বাংলা সিনেমার স্বর্ণ যুগের সূচনা হয়েছিল, যা পরের তিনটি দশকে সৃষ্টি করেছিল বাংলা সিনেমার প্রবল জোয়ার সিনেমাশিল্পের বেঁচে থাকা নির্ভর করে দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহের টিকিটঘরে ভিড় করার ওপর, যাকে বলে ‘বক্স অফিস’ ১৯৪৪এর সেপ্টেম্বরে পরিচালক বিমল রায়ের ‘উদয়ে পথে’ ছবিটি প্রবল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল । চলচ্চিত্রবেত্তারা বলেন ‘উদয়ের পথে’ই বাংলা সিনেমার ভবিষ্যতে ‘রোড ম্যাপ’ নির্দেশ করেছিল । পঞ্চাশ থেকে আশি এই ত্রিশ বছরে নিশ্চিতভাবেই বহু মানুষের সৃষ্টিশীলতা জড়িয়ে আছে বাংলা সিনেমা শিল্পে, তথাপি বাংলা সিনেমার একশো বছরের পথচলায় তাঁর কথা পৃথক ভাবে মনে করতেই হবে । তিনি উত্তম কুমার । তাঁর অভিনয়ের গুণে কত দূর্বল কাহিনীর সিনেমাও যে বক্স অফিসে হিট করেছিল তার ইয়ত্তা নেই । ৩২ বছরের অভিনয় জীবনে ২০০র বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন উত্তম । ১৯৫৩তে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে নায়িকা সুচিত্রা সেনের সঙ্গে নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তারপর উত্তম-‘সূচিত্রা’ জুটি বাংলা সিনেমার ‘মিথ’ হয়ে আছে১৯৭৫ পর্যন্ত কুড়ি বছরেরও বেশি সময় ধরে ‘উত্তম-সুচিত্রা’ জুটি মূল স্রোতের বাংলা সিনেমার বেঁচে থাকার রসদ যুগিয়েছিল । সুচিত্রা বা সুপ্রিয়া চৌধুরীর সঙ্গে রোমান্টিক নায়ক চরিত্রে অভিনয় ছাড়াও উত্তম অভিনীত বহু বাংলা সিনেমা অবিস্মরণীয় হয়ে আছে যার মধ্যে কয়েকটি উল্লেখ করি । সাহেব বিবি গোলাম (১৯৫৬), ডাক্তার বাবু(১৯৫৯), মরুতীর্থ হিংলাজ (১০৫৯), খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন (১৯৬০), জতুগৃহ (১৯৬৪), ঝিন্দের বন্দী(১৯৬৪), নায়ক (১৯৬৬), চিড়িয়াখানা (১৯৬৭), অগ্নীশ্বর (১৯৭৫) ধন্যি মেয়ে প্রভৃতি । তাঁর অভিনয় গুণে বাংলা সিনেমার সম্পদ হয়ে আছে । রোমান্টিক নায়ক হিসাবে উত্তম অকল্পনীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন এটা কোন নতুন তথ্য নয় । শেষের দিকে উত্তম তাঁর রোমান্টিক ইমেজ থেকে বেরিয়ে এসে অসাধারণ চরিত্রাভিনেতা হয়ে উঠছিলেন । সেই সময়েই বাংলা চলচ্চিত্রের সংকটের সময় তিনি আচমকা চলে গেলেন ১৯৮০র ২৪শে জুলাই । তত দিনে বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ষয়ের কাল, শূন্যতার কাল  শুরু হয়ে গেছে । উত্তমকুমার ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক প্রতিষ্ঠান ।

    বাংলা সিনেমার স্বর্ণসময়ে সিনেমায় উত্তমকুমার অনেকটা দায়ই নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন ঠিকই, এবং সেটা সম্ভব হয়েছিল কারণ সমকালে বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছিলেন অসামান্য অনেক চরিত্রাভিনেতা - ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ী সান্যাল, জহর গাঙ্গুলী, কমল মিত্র, অসিতবরন, বিকাশ রায়, কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, বসন্ত চৌধুরী, অনুপ কুমার, অনিল চট্টোপাধ্যায়, নির্মল কুমার, তুলসী চক্রবর্তী, রবি ঘোষ, উৎপল দত্ত, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, ছায়া দেবী প্রমুখ । এইসব অসামান্য চরিত্রাভিনেতাদের অভিনয়ের মধ্যে ধরা আছে বাংলা চলচ্চিত্রের অভিনয়ের বিবর্তনের ধারা বা ইতিহাস । বাংলা সিনেমার সেই স্বর্ণসময়ের সিনেমাগুলির বক্স অফিস সাফল্যের একটা সহজ রসায়ন ছিল, তা হল মধ্যবিত্ত জীবনের হাসি-কান্নার গল্প, এঁদের অভিনয়, এবং হৃদয় দোলানো গান।

আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প তার শক্তি অর্জন করেছিল স্বাধীনতার পরে - বিশ্ব চলচ্চিত্র শিল্পের আসরে এক পংক্তিতে বসার মত শক্তি । গর্ব করার মত অনেক উপাদান সে দিয়েছেও বাঙালিকে এই স্বাধীনতা-উত্তর সত্তর বছরে । অথচ আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের কোন তাপ-উত্তাপ প্রাক-স্বাধীনতা পর্বের চলচ্চিত্রে পড়েছিল এমন বলা যাবে না । পড়া সম্ভবও ছিল না ব্যবসায়িক সার্থে নিয়ন্ত্রিত এই শিল্পমাধ্যমে । স্বাধীনতা আন্দোলনের আবেগ ঘেরা দুটি ছবি আমরা পেয়েছিলাম স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে ১০৫১তে (‘ভুলি নাই’ এবং ‘বিয়াল্লিশ’) সাতচল্লিশে দেশ যখন স্বাধীন হল বাংলা সবাক চলচ্চিত্রে বয়স মাত্র ১৫ বছর আর আগের ১৩ বছরের নির্বাক যুগের হিসাব ধরলে সাকুল্যে বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের বয়স ছিল মাত্র ২৮ বছরস্বাধীনতার আগের ১৫টা বছর ছিল বাংলা চলচ্চিত্রে ডালপালা ছড়ানোর কাল

সমান্তরাল সিনেমা – সত্যজিৎ - মৃণাল ঋত্বিক

আবার ওই সময়ে – চল্লিশের দশকের শেষ পর্বেই বাংলা চলচ্চিত্রশিল্প নিয়ে সমান্তরাল সিনেমা-ভাবনারও সূচনা হয়েছিল । গত শতকের চল্লিশের দশকটা ছিল বাংলার সারস্বতভূমির মহা সৃজনকাল । কথাসাহিত্যে তিন বন্দ্যোপাধ্যায় – তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, মানিক, কবিতায় জীবনানন্দ দাস, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, নৃত্যকলায় উদয়শঙ্কর, সঙ্গীতে শচীনদেব বর্মন প্রমুখ উজ্বল জ্যোতিষ্কদের পাশে শম্ভু মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরীর মত নবীনদের দীপ্তিতে আলোকিত বাংলার সারস্বতভূমি, শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের সৃজনভূমিতে নতুন চেতনা ও বোধের স্পর্শ, যদিও বাংলা চলচ্চিত্রে এই নবচেতনা ও বোধের ছোঁয়া তখনও লাগেনি । তখনকার বিশ্ব চলচ্চিত্রের সঙ্গে ভারতীয় সিনেমার মানের কোন তুলনাই হয় না। চলচ্চিত্র যে এক শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম, এর যে জীবনের সাথে যোগ থাকতে পারে, জীবনের মূল সত্যকে যে চলচ্চিত্র স্পর্শ করতে পারে এই সত্যটা সেই সময়ের চলচ্চিত্রকারদের ছিল না । স্বাধীনতা-উত্তর কালে বাংলা চলচ্চিত্রে এই বোধের স্পর্শটাই আমাদের প্রথম প্রাপ্তি১৯৪৮এ কলকাতার ইংরাজি দৈনিক ‘দি স্টেটসম্যান’এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে সত্যজিৎ রায় লিখেছিলেন “দি র-মেটেরিয়াল অফ সিনেমা ইজ লাইফ ইটসেলফ । ইট ইজ ইনক্রেডিবল দ্যাট আ কাউন্ট্রি দ্যাট হ্যাস ইনস্পায়ার্ড সো মাচ পেইন্টিং এন্ড মিউজিক এন্ড পোয়েট্রি শুড ফেইল ট মুভ সিনেমা মেকার । হি হ্যাজ ওনলি টু কিপ হিজ আইস ওপেন” (উদ্ধৃতি সূত্র :’সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্রে ও নেপথ্যে’/অসীম সোম)   মূল স্রোতের সিনেমার পাশে সমান্তরালয় সিনেমা নির্মাণের সূচনা দেখলাম পঞ্চাশের দশকে ।

ইতিমধ্যে ১৯৪৩এ বিশ্বভারতীর চিত্রকলা শিক্ষা শেষ না করে কলকাতায় ফিরে এসেছেন সত্যজিৎ রায় । ১৯৪৭এর অগস্টে সমমনা চলচ্চিত্রপ্রেমি বন্ধু চিদানন্দ দাশগুপ্ত, হরিসাধন দাশগুপ্ত, বংশী চন্দ্রগুপ্ত  প্রমুখদের নিয়ে গঠন করেন ‘ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি’ সেখানে বিশ্বখ্যাত সিনেমাগুলি সংগ্রহ করে দেখতেন সিনেমা শিল্পের নানান দিক সম্পর্কে নিজেদের সমৃদ্ধ করতেন । বিজ্ঞাপন সংস্থা ডি যে কীমারএ চাকুরী কালীন লন্ডনে ‘দি বাইসাইকেল থিফ’ দেখে সত্যজিৎ স্থির করেন চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। পথের পাঁচালীর কিশোর সংস্করণ ‘আম আঁটির ভেপু’ প্রকাশ করবে সিগনেট, তার ছবি আঁকার কথা সত্যজিতের লন্ডন থেকে ফেরার পথে জাহাজে বসে ছবিগুলি আঁকলেন, আর এই ছবিগুলিই হল  ‘পথের পাঁচালী’র এক একটি দৃশ্যের ফ্রেম - পথের পাঁচালীর প্রকৃত চিত্রনাট্য তার পরের বৃত্তান্ত তো ইতিহাস । সমস্ত প্রকুলতা জয় করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অর্থানুকুল্যে নির্মাণ করলেন ‘পথের পাঁচালী’ – নির্মাণ করলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রশিল্পের নতুন ইতিহাস । মুক্তি পেল ভারতীয় চলচ্চিত্রে এতাবৎ কালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবদলিল ‘পথের পাচালী’ ১৯৫৫র এপ্রিলে নিউইয়র্কে এবং অগস্টে কলকাতায় ।

এই সময় থেকেই বানিজ্যিক বা মূল স্রোতের পাশাপাশি ‘সমান্তরাল সিনেমা’র কথা উঠে এল অনিবার্যভাবে । পঞ্চাশের দশকেই বাংলা সিনেমা পেলো ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনকে । চল্লিশ-পঞ্চাশ দশকে সাহিত্যে যেমন তিন বন্দ্যোপাধ্যায় – বিভূতিভূষণ –তারাশঙ্কর - মানিক , পঞ্চাশ-ষাটের থিয়েটারে যেমন শম্ভূ মিত্র- উৎপল দত্ত- অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়,বাংলা চলচ্চিত্রেও তেমনই স্বাধীনতা-উত্তর সত্তর বছরের সেরা প্রাপ্তি সত্যজিৎ, ঋত্বিক ঘটক ও মৃণাল সেন । এঁদের সব নির্মাণ বানিজ্যিক সাফল্য পায়নি সত্য কিন্তু কে অস্বীকার করবে  ভারতীয় চলচ্চিত্রকে বিশ্বের চলচ্চিত্রের আসরে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে এদের অসামান্য অবদান ! সত্যজিৎ চলে গেছেন ১৯৯২এ, মৃণাল সেন (৯৪) ২০০২এ শেষ ছবি ‘আমার ভুবন’ করার পর বেঁচে ছিলেন আরো ১৬ বছর  । কিন্তু ঋত্বিক ঘটক যেন অনাবিষ্কৃতই থেকে গেলেন মাত্র ৫১ বছর বয়সে নিজের অমন সৃষ্টিশীল জীবনের ‘অপচয়’ ঘটিয়ে । ১৯৫২ থেকে ১৯৭৪ এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র সাতটি ছবি নির্মাণ করতে পেরেছিলেন । কোন প্রযোজক এগিয়ে আসতেন না তাকে দিয়ে ছবি করাতে । ১৯৬৫তে ‘সূবর্ণরেখা’ দর্শক আনুকুল্য পাবার পরেও তাকে নয় বছর বসে থাকতে হয়েছিল । ১৯৭২এ ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ করার পর শেষ ছবি করেন ১৯৭৪এ ‘যুক্তি তক্ক আর গল্প’ ১৮৭৪এ নিজের তাবৎ শিল্পকর্মের মধ্যে ঋত্বিকের অন্বেষণ ছিল এক ‘শিল্পভাষা’র যা দিয়ে মানুষের কাছে পৌছানো যায় । লিখেছিলেন

... এ ভাষা জন্মাইতে পারে শুভ্র উত্তাপময় প্রেরণা হইতে । সে প্রেরণা, মনে হয়, পেশাদার বায়োস্কোপের লোকের দ্বারা হইবে না । ... খুব খানিকটা না রাগিলে, খুব ভালো না বাসিলে, খুব না কাঁদিলে, এ আদিম ভাষা কোথা হইতে উঠিবে” ? (ঋত্বিক পত্নী সুরমা ঘটকের ‘ঋত্বিক’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত)

    বহুচর্চিত ‘সমান্তরাল সিনেমা’র বাইরে যে দুজন চিত্রনির্মাতার কাজ বাংলার চলচ্চিত্র শিল্পে স্মররণীয় হয়ে আছে, থাকবেও তাঁরা হলেন তপন সিংহ ও তরুণ মজুমদার । দুজনেই জানতেন সংস্কৃতিমনা বাঙালির রুচি কেমন সিনেমায়, অথচ জনরুচির সিনেমা নির্মাণে তাঁদের কেউই চলচ্চিত্র জীবনে কোন সমঝোতা করেছেন এমন জানা যায় না । দুজনেই সিনেমাই মূলত সাহিত্যনির্ভর । তপন সিংহ সেলুলয়েডে এনেছেন রবীন্দ্রনাথ থেকে বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, বনফুল, সমরেশ বসু, রমাপদ চৌধুরী, শঙ্কর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখের গল্প, তেমনই তরুণ মজুমদারও মনোজ বসু, বিমল কর, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, বনফুল প্রমুখের কাহিনী চিত্রায়িত করেছেন । তপন সিংহ’র দীর্ঘ ষাট বছরের চলচ্চিত্র জীবনে ১৯৫৪তে ‘অঙ্কুশ’ থেকে শেষ ছবি ’আনোখা মতি’(হিন্দি) পর্যন্ত ৬টি হিন্দি সহ মোট বিয়াল্লিশটি  ছবি নির্মাণ করেছেন যার মধ্যে একটাও এমন ছবি নেই যা প্রযোজককে মুনাফা দেয়নি । চলচ্চিত্র বোদ্ধারা নিশ্চিতভাবেই স্বীকার করবেন যে স্বাধীনতা-উত্তর ‘মেইনস্ট্রিম’ বা মূল স্রোতের সিনেমায় এতাবৎকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্র নির্মাতার মর্যাদা পাবেন তপন সিংহ তাঁর কাবুলিওয়ালা(১৯৫৭), ক্ষুধিত পাষাণ (১৯৬০),  ঝিন্দের বন্দী (১৯৬১) জতুগৃহ (১০৬৪) হাটে বাজারে(১৯৬৭), আপনজন ( ১৯৬৮), সাগিনা মাহাতো (১৯৭০), আতঙ্ক (১৯৮৬), হুইলচেয়ার (১৯৯৪) স্বাধীনতা-উত্তর সত্তর বছরের কয়েকটি সুপারহিট ছবি ।   তরুণ মজুমদারের সিনেমার সহজ রসায়ণ ছিল ভালো গল্প ও মন ছোঁয়া গান এই রসায়ণে নির্মিত পলাতক (১৯৬৩), আলোর পিপাশা(১৯৬৫), বালিকা বধু (১৯৬৭), শ্রীমান পৃথ্বিরাজ(১৯৭৩), ফুলেশ্বরী(১৮৭৪), গণদেবতা(১৯৭৮), ভালোবাসা ভালোবাসা, দাদার কীর্তি, আলো (২০০৩) দেখতে দর্শক টিকিট কাউন্টারে ভিড় করেছে । সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এই ত্রয়ীর সমকালেই আর একজন চিত্রনির্মাতা রাজেন তরফদার এখন প্রায় বিস্মৃতির আড়ালে চলে গিয়েছেন । অথচ পঞ্চাশ-ষাটের দশকে বাংলা চলচ্চিত্রের নবচেতনার কালে সতজিৎ-মৃণালদের সঙ্গে এক বন্ধনীতে উচ্চারিত হত রাজেন তরফদারের নাম । মাছ-মারাদের জীবন নিয়ে  ‘গঙ্গা’ তার সাড়াজাগানো ছবি ১৯৬০এর নভেম্বরে মুক্তি পেয়েছিল । ১৯৫৭তে প্রথম ছবি ‘অন্তরীক্ষ’ও ব্যতিক্রমী ছবি হিসাবে সমাদৃত হয়েছিল । ১৯৭৬এ ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় নির্মাণ করেন ‘পালঙ্ক’ ১৯৫৭ থেকে ১৯৮৭ এই তিন দশকে মাত্র সাতটি সিনেমার নির্মাণ করেছিলেন রাজেন তরফদার

    সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এই ত্রয়ীর বিছানো পথে আরো কয়েকজন তরুণ চিত্রনির্মাতা সমৃদ্ধ করেছেন স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা চলচ্চিত্রকেসত্তর দশকে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত আশির দশকে গৌতম ঘোষ, উৎপলেন্দু চক্রবর্তী, নব্বইএর দশকে অকাল প্রয়াত ঋতুপর্ণ ঘোষ প্রমুখ । তাঁদের অনেক ছবি দেখতে দর্শক টিকিট কাউন্টারে ভিড় করেছেন, আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জন করেছে এবং ভালো বাংলা সিনেমার ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে চলচ্চিত্র বোদ্ধারা চলচ্চিত্র বিষয়ক আলোচলায় সত্যজিৎ -ঋত্বিক-মৃণালকে আলোকিত করেই থেমে যান, কিছুটা গৌতম ঘোষ ও বুদ্ধদেব দাসগুপ্ত, অপর্ণা সেন আসেন তাঁদের আলোচনায়অনালোকিত থাকেন মেইনস্ট্রীম সিনেমার  নীরেন লাহিড়ী, অগ্রদূত, অর্ধেন্দু মুখার্জী, পীনাকী মুখার্জী, অরবিন্দ মুখার্জী, অসিত সেন, অজয় কর, সুশীল মজুমদার, কার্তিক চট্টোপাধ্যায়, হরিদাশ ভট্টাচার্য, পিযুষ গাঙ্গুলী, পরিচালক বিকাশ রায়েরা । স্বাধীনতা পরবর্তী সময়কালে, বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের বেড়ে ওঠায় এদের অসামান্য অবদান রয়েছে । এদের চলচ্চিত্র দেখতে বাঙালি প্রেক্ষাগৃহের টিকিট কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন দিয়েছে, বিনোদিত হয়েছে । একটি নিবন্ধের পরিসরে কত জনকেই বা ছোঁয়া সম্ভব ! তবু এইসব ছবিগুলি আমাদের মূল স্রোতের সিনেমায় অবিস্মরণীয় হয়ে আছে । পিনাকী মুখার্জী পরিচালিত ঢুলি (১৯৫৪), চৌরঙ্গি (১৯৬৮) অগ্রদূতের অগ্নিপরীক্ষা (১৯৫৪), সবার উপরে (১৯৫৫), সাগরিকা (১৯৫৬) পথে হল দেরি(১৯৫৭), কার্তিক চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত চন্দ্রনাথ (১৯৫৭), অজয় কর পরিচালিত হারানো সুর (১৯৫৭), সপ্তপদী( ১৯৬১),সাত পাকে বাঁধা (১৯৬৩), চিত্ত বসুর ছেলে কার (১৯৫৪), মায়ামৃগ, বন্ধু, সুশীল মজুমদারের পুষ্পধনু (১৯৫৯), হসপিটাল(১৯৬০), লাল পাথর (১৯৬৪), অসিত সেন পরিচালিত  চলাচল(১৯৫৬), পঞ্চতপা(১৯৫৭), দ্বীপ জ্বেলে যাই(১৯৫৯), উত্তর ফাল্গুনী (১৯৬৩, মমতা(১৯৬৬), সুধীর মুখার্জী পরিচালিত শাপমোচন (১৯৫৫), শেষ পর্যন্ত, দুই ভাই(১৯৬১) যাত্রিকের ‘কাঁচের স্বর্গ’, ‘স্মৃতিটুকু থাক’ নীরেন লাহিড়ীর ‘ইন্দ্রাণী’(১৯৫৮), ‘রাইকমল’, হরিদাশ ভট্টাচার্যর ‘সন্ধ্যা দীপের শিখা’ (১৯৬৪), কমললতা (১৯৬৯),নব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের ‘অদ্বিতীয়া’(১৯৬৮), সলিল দত্ত পরিচালিত স্ত্রী,  সরোজ দে পরিচালিত ডাকহরকরা, বিজয় বসু পরিচালিত আরোগ্য নিকেতন, বিকাশ রায় পরিচালিত ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ (১৯৫৯), কেরী সাহেবের মুন্সী, অরবিন্দ মুখার্জীর ‘ধন্যি মেয়ে’(১৯৭১), ‘অগ্নিশ্বর’(১৯৭৫),  সুনীল ব্যানার্জীর ‘দেয়া-নেয়া’(১৯৬৩) এমন কত ছায়াছবি আমাদের স্মৃতিতে উজ্বল হয়ে আছে ।

ক্ষয়ের কাল

    আশি ও নব্বই দশক থেকে বাংলা সিনেমায় লক্ষ্যণীয় শূন্যতা এলো । ছবির কাহিনী অভিনয়, সঙ্গীত – সব ক্ষেত্রেই শূন্যতা । পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর এই ত্রিশ বছরে বাংলা ছবির বানিজ্যিক সাফল্যের রসায়ণ ছিল সাহিত্যনির্ভর চিত্রনাট্য, হেমন্ত, মান্না, সন্ধ্যা শ্যামল মিত্রদের গান আর রোম্যানটিক অভিনয় এবং বলিষ্ঠ নারী চরিত্রের রূপায়ন । উত্তমকুমার, ছবি বিশ্বাস, অনিল চট্টোপাধ্যায়, বিকাশ রায়, পাহাড়ী সান্যাল, বসন্ত চৌধুরী, কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অনুপ কুমার, সুচিত্রা সেন, অনুভা গুপ্তা, ছায়া দেবী, অরুন্ধতি দেবী, সুপ্রিয়া চৌধুরী, সাবিত্রি চট্টোপাধ্যায় মত শক্তিশালী অভিনেতা-অভিনেত্রীর অভিনয়, পরিচালকের শিল্পরুচি ও মধ্যবিত্ত বাঙালির মন ছোঁয়া গানের প্রয়োগ এই রসায়নেই বাঙালি সিনেমা হলে ভিড় জমাতোঅনেক দুর্বল কাহিনীর ছায়াছবি শুধুমাত্র উত্তমকুমারের অভিনয় গুণে বানিজ্যিক সাফল্য এনে দিয়েছে কিংবা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, মান্নাদে’র গানের প্রয়োগের গুণে প্রযোজক লাভের মুখ দেখেছে । ১৯৬২তে মোটর দুর্ঘটনায় নিহত ছবি বিশ্বাস ও ১৯৭৪এ পাহাড়ী সান্যালের চলে যাওয়ার অভাব সামলে উঠতে পেরেছিল বাংলা ছায়াছবি, কিন্তু জুলাই ১৯৮০তে উত্তমকুমারের চলে যাওয়াটা সামলাতে পারলো না । তার আগেই ১৯৭৯তে অন্তরালে চলে গেলেন সুচিত্রা সেন । এই দুজনের অভাব পুরণ করার মত কেউই থাকলেন না বাংলা সিনেমায় । তারপর একে একে চলে গেলেন অনেকেই । অশিতিপর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এখনও তাঁর অভিনয় দিয়ে বাংলা সিনেমাকে সমৃদ্ধ করছেন বটে, কিন্তু একা আর কতটুকু টানবেন ধুঁকতে থাকা বাংলা সিনেমাকে ! প্রসেনজিৎ, চিরঞ্জিত, ঋতুপর্ণা, পাওলি দামরা উত্তম, সূচিত্রা, সাবিত্রিদের উচ্চতাকে অতিক্রম করতে পারবেন এমন কথাও বলা যাচ্ছে না । ১৯৭৬এ চলে গেলেন সঙ্গীত পরিচালক নচিকেতা ঘোষ, ১৯৭৭এ অনিল বাগচী, গীতিকার প্রণব রায়, ১৯৮৬তে গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, ১৯৮৭তে পরিচালক রাজেন তরফদার, অভিনেতা বিকাশ রায় ও সুরকার-গায়ক শ্যামল মিত্র আর ১৯৮৯তে তাঁর চুয়ান্ন বছরের সংগীত সফর শেষ করে চলে গেলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় । বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণে এঁদের শূন্যতা সহজে পুরণ হবার নয়, হয়নিও

    আবার নব্বই থেকেই বাংলা চলচ্চিত্রের ঘুরে দাঁড়ানোর সংকেতও পাওয়া গিয়েছিল ২০১৩তে অকাল প্রয়াত ঋতুপর্ণ ঘোষ এই পর্বের সাড়াজাগানো চিত্র নির্মাতা । ১৯৯২এ তাঁর প্রথম ছবি ‘হীরের আংটি’র পর ‘১৯শে এপ্রিল’(১৯৯৪), ‘দহন’ (১৯৯৭), ‘উৎসব’(২০০০), ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ (২০০৮),‘আবহমান’ (২০০৯) প্রভৃতি যেমন বানিজ্যিক সাফল্য পেয়েছে, তমনই নানান রাষ্ট্রীয় সম্মানও অর্জন করেছিল ।  প্রভাত রায়, রাজা সেন প্রমুখও এই পর্বে বেশ কিছু বানিজ্যসফল সিনেমা নির্মাণ করেছেন । বাংলা সিনেমাশিল্পের সার্বিক সংকটের মধ্যেও এই শতকের  দুটি দশকে বেশ কিছু তরুণ চিত্রনির্মাতা সুরুচিসম্পন্ন ও বানিজ্যিকভাবে সফল সিনেমা নির্মাণ করছেন । গত দশ বছরে আরো বেশ কয়েকটি ভালো বাংলা সিনেমা আমরা পেয়েছি আবহমান, ইতি মৃণালিনী, জাতিস্মর, মুক্তধারা, ল্যাবরেটরি, রামধনু, গল্প হলেও সত্যি, চাঁদের পাহাড়,  নাটকের মত, রাজকাহিনী, শুধু তোমারই জন্য, বিসর্জন, বেলাশেষে প্রভৃতি বক্স অফিস আনুকুল্য পেয়েছে, কেউকেউ রাষ্ট্রীয় সম্মাননাও পেয়েছেনএকটা হিসাবে দেখছি কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’(২০১৩) ব্যবসা করেছে ১৬.৫৩ কোটি টাকার, সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘মিশর রহস্য’(২০১৩) ৮.৫ কোটি, ‘রাজকাহিনী’ ৬.৭ কোটি, ‘জুলফিকার’ ৮.৫ কোটি, নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘প্রাক্তন’ ব্যবসা করেছে ৮.৫ কোটির । এটা বাংলা সিনেমা শিল্পের একটা ইতিবাচক দিক নিশ্চিতভাবেই । তবুও, কমলেশ্বর মুখার্জী, রাজ চক্রবর্তী, সৃজিত, শিবপ্রসাদদের কাজের মূল্যায়ন করার সময় এখনও আসেনি । এদের মধ্যে কাউকেই সত্যজিৎ, তপন সিংহ, মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদারের বিকল্প ভাবা যাচ্ছে না য়াল

    বাংলা চলচ্চিত্র তার জন্মলগ্ন থেকেই সাহিত্যনির্ভর আর সেই সাহিত্যে বরাবরই নারী চরিত্র অঙ্কিত হয়েছে অসামান্য দক্ষতায় সমাজ বাস্তবতাকে মনে রেখে । বাঙালি চলচ্চিত্রে নিটোল গল্প চায়, চায় সেই গল্পের মধ্যে নিজেকে খুজে পেতে । এই সময়ের শক্তিময়ী অভিনেত্রীরা সৃষ্টি করেছেন বাস্তবের রক্ত-মাংসের নারী চরিত্র যারা আপন বোধ ও মননে,হাসি-কান্নায়,আবেগে,সরলতা-শঠতায়,হিংসা-বিদ্বেষে,প্রেম-বিষাদে,বুদ্ধিমত্তায় বাস্তব্জীবনের বিশ্বাসযোগ্য বাঙালি নারী । তাই এইসব অভিনেত্রীদের কাছ থেকে পেয়েছি সর্বজয়া’(পথের পাচালি/ উমা দাশগুপ্ত) আরতী(মহানগর/ মাধবী) (মাধবী), ‘নীতা’ (সুপ্রিয়া / মেঘেঢাকা তারা), ‘পান্নাবাঈ’ (সুচিত্রা / উত্তর ফাল্গুনী), ‘আরতী’(মাধবী / মহানগর), ‘দয়াময়ী’(শর্মিলা / দেবী), ‘ফুলি’ (সন্ধ্যা রায় / ফুলেশ্বরী), রুমা গুহ ঠাকুরতা (পলাতক), অরুন্ধতি দেবী (‘ক্ষুধিত পাষাণ’) ‘চিনু’ (মমতাশঙ্কর / একদিন প্রতিদিন) ইত্যাদি আরো কত চরিত্র

    গত শতকের আশির দশকে পৌঁছে বাঙালির বিনোদন জগতে অনেক কিছুর বদল ঘটে গেল, বাংলা সিনেমারও । পণ্যায়ন সৃষ্টি করলো আমাদের রুচির সংকট । সাহিত্যনির্ভর কাহিনীকে বিদায় দিলেন প্রযোজকরা । তারাই ঠিক করে দিতে লাগলেন সিনেমার স্টোরিলাইনমৌলিক নারী চরিত্র হারিয়ে গিয়ে সিনেমায় এলো মারপিট জানা নায়ক আর চটুল নাচ-গান করা নায়িকা । তাদের পোষাক, আচার আচরণও কেমন বদলে গেল। তারা যেন আর মধ্যবিত্ত বাঙালি নারীর প্রতিনিধিই নয় । নায়িকাপ্রধান সিনেমার নির্মাণই বন্ধ হয়ে গেল । কেউ কষ্ট করেও মনে করতে পারবেন না, বাংলা চলচ্চিত্রে গত ত্রিশ বছরে কটা স্মরণীয় নারী চরিত্র সৃষ্টি হয়েছে ! আশির পর দেবশ্রী রায়, শতাব্দি রায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, রূপা গাঙ্গুলী, মুনমুন সেন, ইন্দ্রাণী হালদাররা যখন সিনেমায় এলেন ততদিনে পণ্যায়নজাত রুচির সংকট আর সৃজনশীলতার দেউলিয়াপনা বাংলা সিনেমার শরীরে থাবা বসিয়েছে । এই শতকের পাওলি দাম বা রাইমা সেনদের সাধ্য কি দেউলিয়াপনার সেই থাবা থেকে বাংলা সিনেমাকে উদ্ধার করেন ! এদের অভিনয় প্রতিভা অব্যবহৃতই থেকে গেল ।

    সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ভালো এবং ব্যবসায়িকভাবে সফল সিনেমা আমরা পাচ্ছি ঠিকই কিন্তু তা বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের সাম্প্রতিক অবস্থার একটা অতি খন্ড চিত্র মাত্র । এদের ছবিগুলো প্রায় সবই শহুরে এলিট দর্শকদের মাথায় রেখেই নির্মিত,তাদের সমাজের কথা, তাদের অন্তর্দ্বন্দ্বই এইসব ছবির কাহিনীসার, সাধারণ মানুষের যাপনচিত্র তাদের পারিবারিক হাসি-কান্না, বিষাদ-বিপন্নতার গল্প তেমনভাবে পাই না এই সব ছবিতে । এখনো সাধারণ বাঙালি সিনেমাপ্রেমিক সিনেমাকে বইবলে, যার অর্থ বইয়ের মতই নিটোল গল্প চায় সিনেমার মধ্যে, চায় সেইসব সিনেমার চরিত্ররা হবে তাদের মত । এখন রাজ চক্রবর্তী, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, কমলেশ্বর, সৃজিৎ, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়রা ভালো ছবির নির্মাণ করছেন, ব্যবসায়িক সাফল্যও পাচ্ছেন । তারাও সাহিত্যনির্ভর সিনেমার নির্মাণ করছেন না কেন, মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতিনিধিত্বমূলক নারী চরিত্র সৃষ্টি করছেন না কেন এ বড় বিস্ময় ।

 

           বেশ কিছু ভালো এবং ব্যবসায়িকভাবে সফল সিনেমা আমরা পাচ্ছি ঠিকই কিন্তু তা বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের সাম্প্রতিক অবস্থার একটা অতি খন্ড চিত্র মাত্র । এদের ছবিগুলো প্রায় সবই শহুরে এলিট দর্শকদের মাথায় রেখেই নির্মিত,  তাদের সমাজের কথা, তাদের অন্তর্দ্বন্দ্বই এইসব ছবির কাহিনীসার, সাধারণ মানুষের যাপনচিত্র তাদের পারিবারিক হাসি-কান্না, বিষাদ-বিপন্নতার গল্প তেমনভাবে পাই না এই সব ছবিতে এখনো সাধারণ বাঙালি সিনেমাপ্রেমিক সিনেমাকে ‘বই’ বলে, যার অর্থ বইয়ের মতই নিটোল গল্প চায় সিনেমার মধ্যে । তপন সিংহ নেই, তরুণ মজুমদার ছবি করার জন্য প্রযোজক পাচ্ছেন না, (অনেকদিন পর তরুণ মজুমদার অতি সম্প্রতি ‘ভালোবাসার বাড়ি’ নামে একটা ছবি করেছেন) প্রভাত রায়ও ছবি করতে পারছেন না । হিন্দি সিনেমা ও টেলিভিশনের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ১১০০ সিনেমা হলের মধ্যে এখন সাকুল্যে ৪০০টি প্রেক্ষাগৃহ রয়েছে সারা বাংলায় বাংলা ছবি চালিয়ে হল মালিকের ঘরে মুনাফা ঢোকেনা যে ! অভিনয় শিল্পীরা পেটের দায়ে মাথামুন্ডুহীন টেলিসিরিয়ালে কাজ খুঁজছেন । গাদা গাদা তৃতীয় শ্রেণীর মুম্বাই ছবি বাংলায় ডাবিং করে বাজারে ছাড়ছেন সিনেমা ব্যবসায়ীরাএখনও কলকাতার ভালো ছবি করিয়েদের  উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য মুম্বাই, চেন্নাই ছুটতে হয় । টালিগঞ্জের জীর্ণ ল্যাবরেটরি আর মোটেই ভরসা জোগাতে পারছে না তাদের বাংলা সিনেমা ধুঁকছে আর তামিল ছবি ‘বাহুবলী’ কোটি কোটি টাকার বানিজ্য করে যাচ্ছে । বাংলা সিনেমাশিল্প  ধুঁকছে – বয়সের ভারে নয় মৌলিক সৃষ্টির অভাবে । স্বাধীনতা-উত্তর সত্তর বছরের শেষে পৌঁছে আমি বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের এই চেহারাই দেখছি ।

তথ্যসূত্র : (১) ‘সোনার দাগ’ – গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষ, (২) ‘বাংলা সিনেমার কথকতা’- পার্থ রাহা/বাংলা আকাডেমি পত্রিকা (মে ২০০৪), (৩) ‘নিজেরে হারায়ে খুজি’- অহীন্দ্র চৌধুরী, (৪) ‘সবারে আমি নমি’- কানন দেবী, (৫) ‘ঋত্বিক’- সুরমা ঘটক, (৬) চলচ্চিত্র – চিদানন্দ দাসগুপ্ত (ভারতকোষ),

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বাংলা গানের সেকাল একাল : পর্ব ১৬

  অন্য ধারার গান : গণসঙ্গীত ও সলিল চৌধুরী     গত শতকের চল্লিশের দশকে গণনাট্য আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আর একটি সঙ্গীতধারা সমৃদ্ধ করেছিল বাংলা কা...