নাট্যকথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
নাট্যকথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বাংলা থিয়েটারের আদিপর্ব ও নটী বিনোদিনী

 বাংলা থিয়েটারের আদিপর্ব ও নটী বিনোদিনী

 

 পুরুষতান্ত্রিক আমাদের সমাজে সমাজ প্রগতির প্রক্রিয়ায় নারীর অবদানকে যোগ্য স্বীকৃতি কোনদিনই দেয় না । বাংলা থিয়েটারে আদিপর্বে এক বারাঙ্গনা কন্যা তাঁর তন্ময় সাধনায় ও মেধায় সেকালের অভিনয় জগতের সম্রাজ্ঞী হয়ে উঠেছিলেন ও বাংলা থিয়েটারের নির্মাণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গিয়েছিলেন তার স্বীকৃতিও এই সমাজ দেয় নি । তিনি বিনোদিনী দাসী বা নটী বিনোদিনী । অন্যরকম ভাবে বাঁচার তাগিদে পিতৃপরিচয় হীনা বিনোদিনী থিয়েটারকেই তাঁর মুক্তিতীর্থ ভেবেছিলেন, প্রবল বঞ্চনা ও ছলনার শিকার হয়ে খ্যাতির শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করেও মাত্র ২৩ বছর বয়সে চিরতরে মঞ্চত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন । আশার কথা তাঁর জন্মের সার্ধশত বর্ষে এই মহিয়সী রমণীকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তাঁর জীবনকাহিনি আমরা জানতে চাইছি ।

১৮৭৪এর শেষের দিক, তখন বাংলা থিয়েটারের নিতান্ত শৈশবকাল । ঠিক দুবছর আগে ১৮৭২এর ৭ই ডিসেম্বর সাধারণ রঙ্গালয়ের প্রতিষ্ঠা হয়েছে দীনবন্ধু মিত্রর ‘নীল দর্পন’ নাটক দিয়ে । তার আগে কলকাতার ধনাঢ্য বাবুদের বদান্যতায় জমিদার বাবুদের আঙ্গিনায় সখের থিয়েটার হত মাঝে মধ্যে । কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তখন কলকাতার নতুন বিনোদন থিয়েটার দেখার সুযোগ ছিল না । ন্যাশানাল থিয়েটারের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সাধারণের জন্য থিয়েটারের দরজা উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিল ।  কিন্তু নাটকের নারী চরিত্র রূপায়ন করতেন পুরুষ অভিনেতারাই । ১৮৭৩এ বেঙ্গল থিয়েটারে চারজন বারাঙ্গনা কন্যাকে অভিনেত্রী নিয়োগ করেছিলেন। মেয়েদের কাছে নাট্যাভিনয়ের দরজা খুলে গেলো সেই প্রথম, যে কাজের অক্লান্ত সৈনিক ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত । মধুসূদনের বেঙ্গল থিয়েটারে নাটক দেওয়ার শর্তই ছিল নারীচরিত্রে অভিনয় মেদের দিয়েই করাতে হবে । ১৮৭৩ সালের ১৬ই অগস্ট মধুসূদনের ‘শর্মিষ্ঠা’  নাটকটি দিয়ে বাংলা নাট্যাভিনয়ে অভিনেত্রী নিয়োগের ধারাবাহিকতার সূচনা হয় । এই যুগান্তকারী ঘটনাটি অবশ্য দেখে যেতে পারেননি মধুসূদন, তার আগেই মৃত্যু হয় বাংলা থিয়েটারে অভিনেত্রী নিয়োগের পক্ষে অক্লান্ত সৈনিক মাইকেল মধসূদন দত্তর (২৯জুন ১৮৭৩) ।  বিনোদিনীরা কোন প্রাপ্তির আশায় এসেছিলেন থিয়েটারে ? শুধুই কি অর্থ আর প্রতিপত্তি ?  তাহলে বিনোদিনী গুর্মুখ রায়ের কামনার আগুনে নিজেকে সঁপে দেওয়ার বিনিময়ে অভিনয় শিল্পীদের নিজস্ব থিয়েটার বানানোর স্বপ্ন দেখবেন কেন ?

১৭৯৫এ গেরেসিম লেবেডেফ প্রথম বাংলা নাট্যাভিনয়ের সূচনা করেন । বলা যায় নাট্যাভিনয়ে মেয়েদের অধিকারের একটা সূত্রপাতও হয়েছিল এই সুবাদে । লেবেডের তার ভাষা শিক্ষক গোলকনাথ বসুর মাধ্যমে বারাঙ্গনা পল্লী থেকে তিনজনকে অভিনয় করিয়েছিলেন তার নাটকে । তারপর দীর্ঘ সময় বাংলা নাটকের অভিনয়ের কোন তথ্য পাওয়া যায় না । ১৮৩৫এ শ্যাম বাজারে বাবু নবীনচন্দ্র বসুর বাড়িতে নাট্যাভিনয়ে বারাঙ্গণা পল্লী থেকে অভিনেত্রী সংগ্রহ করা হয়েছিল । কিন্তু পরবর্তী কালে ১৮৭৩ পর্যন্ত সমাজ অনুশাসনের প্রবল চাপে থিয়েটারে অভিনেত্রী নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায় । ১৮৭২এ বাংলার প্রথম সাধারণ রঙ্গালয়ে সাড়া জাগানো ‘নীলদর্পন’ নাটকেও নারী চরিত্রগুলি পুরুষরাই অভিনয় করেছিলেন ।

মেয়েদের জন্য থিয়েটারের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় অন্ধকার জগতের মেয়েরা মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার একটা অবলম্বন পেলেন । তাদের একটা তাগিদ ছিল – মুক্তির তাগিদ । থিয়েটারকে তাই তারা নিজেদের মুক্তিতীর্থ মনে করলেন, থিয়েটারকে ভালোবেসে পবিত্র হতে চাইলেন । এই পথ ধরে বিনোদিনীও এলেন থিয়েটারকে ভালোবাসতে । বারো বছরের বালিকা বিনোদিনী দশটাকা মাস মাইনেতে ভর্তি হয়ে গেলেন গ্রেট ন্যাশানাল থিয়েটারে, নাট্যশিক্ষক অর্ধেন্দু শেখর মুস্তাফি । ১৮৭৫এর শুরুতে অর্ধেন্দু শেখর মুস্তাফির পরিচালনায় গ্রেট ন্যাশানাল থিয়েটার লখনৌ, লাহোর দিল্লী প্রভৃতি স্থানে অভিনয় করে নীলদর্পন, সুরেন্দ্রবিনোদিনী, সতী কি কলঙ্কিনী, গজানন্দ ও যুবরাজ প্রমু্খ ইংরাজ বিরোধী নাটক । বিনোদিনীও সেই দলে ছিলেন । তাঁদের নাটকেই ক্ষিপ্ত হয়ে ইংরাজ শাসন জারি করে কুখ্যাত নাট্যনিয়ন্ত্রণ আইন । গ্রেট ন্যাশানাল বন্ধ হয়ে যায়, বিনোদিনী যোগ দেন বেঙ্গল থিয়েটারে । এখানে বিনোদিনী অভিনয় করলেন ‘মেঘনাদ বধ’ নাটকে প্রমিলা  ‘দুর্গেশ নন্দিনী’’তে আয়েষা, ‘কপাল কুণ্ডলা’ প্রমুখ দুরূহ চরিত্রে । বেঙ্গল থিয়েটারে বিনোদিনী অভিনয় করেছিলেন মাত্র উনিশ মাস আর এই অল্প সময়েই সেকালের সব প্রধান নাট্যকারের নাটকের মুখ্য ভুমিকায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলেন বিনোদিনী । নজরে পড়েন গিরিশ চন্দ্র ঘোষের । গিরিশ চন্দ্র ঘোষ তাঁকে নিয়ে আসেন নিজ মালিকানাধীন ন্যাশানাল থিয়েটারে । চারবছর পরেই গিরিশ চন্দ্রের ন্যাশানাল থিয়েটারের মালিকানা বদল হয় । হীরা জহরতের ব্যবসায়ী মাড়োয়ারি যুবক প্রতাপ চাঁদ জহুরী থিয়েটার ব্যবসায়ে নামেন ও ন্যাশানাল থিয়েটার কিনে নেন । গিরিশচন্দ্র চাকুরী ছেড়ে পেশাদার বেতন ভোগী ম্যানেজার হন । গিরিশচন্দ্রকে সামনে রেখেই প্রতাপ জহুরীর থিয়েটার ব্যবসায়ে নামা । প্রতাপ জানতেন গিরিশচন্দ্র থাকা মানেই বিনোদিনীর থাকা । কেননা ইতিমধ্যেই বিনোদিনীর অভিনয়ই তখনকার নাট্যজগতের প্রধানতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল । বস্তুত, এই সময় থেকে বাংলা থিয়েটার তার শৈশব কাটিয়ে পুরো মাত্রায় পেশাদারী হয়ে ওঠার দিকে পা বাড়িয়েছিল । বিনোদিনীর বারো বছরের অভিনয় জীবনের নয় বছরই কেটেছে গিরিশচন্দ্রের সঙ্গে, অভিনয় করেছেন ৯৬টি নাটকে । বিনোদিনীর নিজের কথায় - “তাঁহার শিক্ষায় আমার যৌবনের প্রথম হইতে জীবনের সার ভাগ অতিবাহিত হইয়াছে” । অর্থাৎ বাংলা থিয়েটারের উদ্ভব পর্বের শৈশব অবস্থা থেকে পেশাদারী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় বিনোদিনীর যোগদান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল । বিনোদিনীকে বাদ দিয়ে ১৮৭৪ থেকে ১৮৮৬ এই একযুগের বাংলা থিয়েটারের কোন আলোচনা করা যায় না ।

কত বড় অভিনেত্রী ছিলেন বিনোদিনী সেকথা বর্ণণা করা এখন স্বভাবতই অসম্ভব । আমাদের নির্ভর করতে হবে সেযুগের সামান্য কয়েকটি পত্র-পত্রিকার প্রতিবেদনে যেটুকু উল্লেখ পাওয়া গেছে তার ওপর । এব্যাপারে নিশ্চিত ভাবেই বিনোদিনীর নাট্যশিক্ষক গিরিশ চন্দ্র ঘোষের মূল্যায়ন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ । দুটি কথা এ বিষয়ে আমরা মনে রাখবো । এক, এগারো বছরের বালিকা বিনোদিনী যখন থিয়েটারে প্রবেশ করলেন তখন সবে মাত্র থিয়েটারে নারী চরিত্র নারীদের দিয়ে রূপায়ন করা শুরু হয়েছে । সুতরাং বিনোদিনীর সামনে অভিনয়ের কোন অনুসরণযোগ্য আদর্শ ছিল না । তাকে শুরু করতে হয়েছিল শূণ্য থেকে । দ্বিতীয়ত, সেকালের অভিনেত্রীরা বারাঙ্গনা হওয়ার কারণে পত্র-পত্রিকাগুলিতে তাদের অভিনয়ের আলোচনা কদাচই থাকতো । বিনোদিনীর প্রথম অভিনয় ১৯৭৪এর ১২ই ডিসেম্বর, গিরিশচন্দ্রের ‘শত্রু সংহার’ নাটকে একটি অপ্রধান চরিত্র দ্রৌপদির সখির ভূমিকায় । মাত্র চার পাঁচটি সংলাপ । মাত্র তিনমাস পরেই ১৮৭৫এর ৬ই মার্চ ‘হেমলতা’ নাটকের নামভুমিকায় এবং ঐ বছরেই মার্চ থেকে মে পর্যন্ত অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফির পরিচালনায় লক্ষ্ণৌ ও লাহোরে আটটি নাটক ‘সতী কি কলঙ্কিনী ?’, ‘নবীন তপস্বিনী’, ‘সধবার একাদশী’, ‘বিয়ে পাগলা বুড়ো’, ‘লীলাবতী’, ‘নীলদর্পণ’ নাটকে প্রধান নারী চরিত্র অভিনয় করেন । অতয়েব আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না অভিনয় দক্ষতার জন্যই মাত্র একবছরের মধ্যে নাটকের ক্ষেত্রে বিনোদিনী কত অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলেন ।

সেকালের সমস্ত প্রধান নাট্যকারের সব নাটকেই প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করতেন বিনোদিনী । বিনোদিনী অভিনীত নাট্য চরিত্রগুলির ওপর চোখ বোলালেই বোঝা যাবে সেযুগের নাটকে বিনোদিনীর অভিনয় তাঁর অপরিহার্যতার কথা অসামান্য অভিনয় দক্ষতা না থাকলে নিশ্চিত ভাবেই সেই সব দুরূহ চরিত্রে বিনোদিনীকে নির্বাচিত করতেন না । সেকালের কয়েকটি প্রসিদ্ধ নাটকের বিনোদিনী অভিনীত চরিত্র এই রকম –

সরোজিনী                     নাম ভূমিকা

দুর্গেশ নন্দিনী              আয়েষা

মেঘনাদ বধ                প্রমীলা

মৃণালিনী                      মনোরমা

কপাল কুন্ডলা             কপাল কুন্ডলা

বিষবৃক্ষ                        কুন্দনন্দিনী

বুড়ো  শালিকের             ফতি

ঘাড়ে রোঁ     

শরৎ-সরোজিনী             সরোজিনী

রাবণবধ                       সীতা

দক্ষযজ্ঞ                        সতী

নল-দময়ন্তী                  দময়ন্তী

শ্রীবৎস চিন্তা                চিন্তা

প্রহ্লাদ চরিত্র                 প্রহ্লাদ

চৈতন্যলীলা                  নিমাই

বিল্বমঙ্গল                     চিন্তামণি

 

বিনোদিনী তাঁর ১২বছরের নাট্যজীবনে চারটি মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন – গ্রেট ন্যাশানাল’ ‘বেঙ্গল থিয়েটার’, ‘ন্যাশনাল থিয়েটার’ ও ‘স্টার থিয়েটার’। নাট্য শিক্ষক পেয়েছিলেন অর্ধেন্দু শেখর মুস্তাফি(গ্রেট ন্যাশানাল) শরৎচন্দ্র ঘোষ (বেঙ্গল) এবং গিরিশচন্দ্র ঘোষ (ন্যাশানাল ও স্টার থিয়েটার) । বেঙ্গল থিয়েটারে দু বছর থাকা কালীন বিনোদিনী যথার্থ পরিণত হয়ে উঠেছিলেন । বঙ্কিমচন্দ্রের মৃণালিনীতে ‘মনোরমা’, ‘কপাল কুন্ডলা’,দূর্গেশ নন্দিনীর ‘আয়েষা’ ও ‘তিলোত্তমা’, মেঘনাদ বধ’এ ‘প্রমীলা’র মত জটিল চরিত্রের অভিনয়ে অসামান্য দক্ষতা দেখিয়েছিলেন । মৃণালিনীতে ‘মনোরমা’র জটিল চরিত্রটিকে বিনোদিনী কেমন বিশ্লেষণ করেছিলেন সেকথা আত্মকথায় লিখে গেছেন “একসঙ্গে বালিকা,প্রেমময়ী যুবতী, পরামর্শদাতা, মন্ত্রী, অবশেষে পরম পবিত্র চিত্তে স্বামী সহ-মরণ অভিলাষিনী দৃঢ়চেতা এক রমণী”। বিনোদিনী তখন ১৪বছরের বালিকা । এমন বিশ্লেষণই বলে দেয় তাঁর অভিনয় প্রতিভার গভীরতা । স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র মৃণালিনীর অভিনয় দেখে মন্তব্য করেছিলেন “আমি মনোরমার চিত্র পুস্তকেই লিখিয়াছিলাম, কখনো যে প্রত্যক্ষ করিব এমন আশা করি নাই । আজ বিনোদের অভিনয় দেখিয়া সে ভ্রম ঘুচিল””।

গিরিশচন্দ্রের সংস্পর্শেই বিনোদিনীর অভিনয় সম্রাজ্ঞীতে উত্তরণ । গিরিশচন্দ্র স্বয়ং লিখেছেন “আমি মুক্তকন্ঠে বলিতেছি যেরঙ্গালয়ে বিনোদিনীর উৎকর্ষ আমার শিক্ষা অপেক্ষা তাহার নিজগুনে অধিক , সূর্যরশ্মিকে প্রতিফলিত করতে মণি খন্ডের প্রয়োজন” । বিনোদিনীর মত সহ-অভিনেত্রী না পেলে গিরিশ চন্দ্রের প্রবাদ প্রতীম নাট্যপ্রতিভার পূর্ণ ব্যাপ্তী ঘটতো না, একথা স্বয়ং গিরিশচন্দ্রও স্বীকার করে গেছেন । বিনোদিনীর ‘আত্মকথা’র ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন গিরিশচন্দ্র, সেখানে তিনি স্বীকার করেছেন “তাহার সর্বতোমুখী প্রতিভার নিকট আমি সম্পূর্ণ ঋণী একথা স্বীকার করিতে আমি বাধ্য ...। অভিনয় করিতে করিতে সে তন্ময় হইয়া যাইত, আপন অস্তিত্ব ভুলিয়া এমন একটি অনির্বচনীয় পবিত্র ভাবে উদ্দীপ্ত হইয়া যাইত, সে সময় অভিনয় অভিনয় বলিয়া মনে হইত না, যেন সত্য ঘটনা বলিয়াই অনুভূত হইত” ।

বিনোদিনী তাঁর বারো বছরের অভিনয়জীবনের নয়বছরই কাটিয়েছেন গিরিশচন্দ্রের সংস্পর্শে, আর এই সময়কালেই তিনি অভিনয় দক্ষতার শিখর স্পর্শ করেছিলেন । সেকালীন বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের শ্রেষ্ঠা অভিনেত্রী ছিলেন শুধু তাই নয়, বিনোদিনীর অভিনয় বাংলা থিয়েটারকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল । সেকালের সমাজ নাট্যাভিনয়কে সম্মানের কাজ বলে মনে করতো না । সম্ভ্রান্ত মানুষজন থিয়েটার থেকে দূরেই থাকতেন । মঞ্চ থেকে সরে যাওয়ার দুবছর আগে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ‘চৈতন্যলীলা’ নাটকে নিমাই চরিত্রের অসামান্য অভিনয় থিয়েটারের সঙ্গে সেকালীন সমাজের ব্যবধানের বেড়া ভেঙ্গে দিয়েছিল । বিনোদিনীর অভিনয় দেখতে আসেন শ্রীরামকৃষ্ণ দেব । বিনোদিনীর নিমাই চরিত্র চিত্রন দেখে ভাববিহ্বল রামকৃষ্ণদেব বিনোদিনীর অভিনয়ের মধ্যে দেখতে পান ‘আসল আর নকল যেন এক’ ।  থিয়েটারে পদার্পন করে ‘থিয়েটারে লোক শিক্ষে হয়’ বলে বার্তা দিলেন রামকৃষ্ণ দেব  । ‘চৈতন্য লীলা’র নিমাই চরিত্রের অভিনয়ে তিনি কি তন্ময় সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন সেকথা বিনোদিনী নিজেই লিখে গিয়েছেন । গিরিশ রচনাবলীর ৩য় খন্ডের পরিশিষ্টে গিরিশচন্দ্র বিনোদিনীর কথা উদ্ধৃত করেছেন লিখছেন “চৈতন্য লীলা রিহার্শালের সময় অমৃতবাজার পত্রিকার এডিটর বৈষ্ণব চূড়ামণি শ্রীযুক্ত শিশির বাবু মহাশয় মাঝে মাঝে যাইতেন এবং আমার ন্যায় হীনা দ্বারা সেই দেব চরিত্র যতদূর সম্বব সুরুচি সংযুক্ত হইয়া অভিনয় হইতে পারে তাহার উপদেশ দিতেন, এবং বারবার বলিতেন আমি যেন সতত গৌর পাদপদ্ম হৃদয়ে চিন্তা করি । আমিও তাঁর কথামত মহাপ্রভুর পাদপদ্ম চিন্তা করিতাম ...। যেদিন ‘চৈতন্য লীলা’ প্রথম অভিনয় করি, তাহার আগের রাত্রে প্রায় সারা রাত্রি নিদ্রা যাই নাই; প্রাণের মধ্যে একটা আকুল উদবেগ হইয়াত যে কেমন করিয়া এই অকুল পাথারে কুল পাইব । প্রাতে উঠিয়া গঙ্গা স্নানে যাইলাম; পরে ১০৮ দুর্গানাম লিখিয়া তাঁহার চরণে ভিক্ষা করিলাম ... আমি যেন তাঁর কৃপা লাভ করি । ... আমি মনে মনে বুঝিতে পারিলাম যে ভগবান আমায় কৃপা করিতেছেন । কেননা সেই বাল্যলীলার সময় ‘রাধা বই আর নাইকো আমার, রাধা বলে বাজাই বাশি-  বলিয়া গীত ধরিয়া যতই অগ্রসর হইতে লাগিলাম ততই যেন একটা শক্তিময় আলোক আমার হৃদয়কে পূর্ণ করিয়া তুলিতে লাগিল ...। শেষে সন্যাসী হইয়া সংকীর্তন কালে ‘হরি মন মজায়ে লুকালে কোথায় / আমি ভবে একা দাও হে দেখা প্রাণ সখা রাখো পায়’ এই গানটি গাহিবার সময়ের মনের ভাব আমি লিখিয়া জানাইতে পারিব না। আমার তখন মনে হইত যে আমি তো ভবে একা , কেহ তো আমার আপনার নাই ! উন্মত্ত ভাবে সংকীর্তনে নাচিতাম , এক এক দিন হইত যে অভিনয়ের গুরুভার সইতে না পারিয়া মুর্ছিতা হইয়া পড়িতাম”। এমন অনন্য অভিনয় প্রতিভায় শ্রীচৈতন্য দেব চরিত্রাভিনয়ের মধ্য দিয়ে বিনোদিনী গ্লানিহীন হতে চেয়েছিলেন । রামকৃষ্ণদেবের আশির্বাদে বিনোদিনীর কলুষমুক্তি ঘটলো আর বঙ্গ রঙ্গালয় থেকেও অশুচিতার বেড়া ভেঙ্গে দিলেন বিনোদিনী । বিনোদিনীর মঞ্চ ত্যাগের পর গিরিশচন্দ্রের মত মহা শক্তিধর নাট্য পরিচালকও ‘চৈতন্যলীলা’ আর মঞ্চস্থ করতে পারেন নি ।

 

এহেন বাংলা থিয়েটার বিনোদিনীকে মনে রাখেনি । বিনোদিনীকে পাওয়ার লোভে গুর্মুখ রায় মুসাদ্দি নামে এক মাড়োয়ারি যুবক থিয়েটারের ব্যবসায়ে নামেন । তিনি একটি থিয়েটারবাড়ি নির্মাণ করে দেবেন, কিন্তু গিরিশ চন্দ্রদের শর্ত দিলেন বিনোদিনীকে তাঁর রক্ষিতা হয়ে থাকার জন্য রাজি করাতে হবে, আর থিয়েটার হবে বিনোদিনীর নামে । নিজেদের থিয়েটার হবে, শিল্পীদের থিয়েটার হবে, থিয়টার হবে তাঁর নামে এই প্রতিশ্রুতিতে বিনোদিনী সম্মত হয়েছিলেন গিরিশ চন্দ্রদের প্রস্তাবে । নানা গন্ডগোলের কারণে গুর্মুখ রায় থিয়েটার বাড়ির বদলে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিলেন বিনোদিনীকে । বিনোদিনী নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকার লোভ হেলায় ত্যাগ করেছিলেন । বলেছিলেন থিয়েটার বাড়ি নাহলে তিনি গুর্মুখের সঙ্গিনী হবেন না । দেড়শ’ বছর আগে পঞ্চাশ হাজার টাকার লোভ হেলায় ত্যাগ করেছিলেন যিনি, তাঁকে প্রতারিত হতে হ’ল তাঁর সহ অভিনেতা নাট্যরথীদের  কাছ থেকে । বাংলা পেশাদারী থিয়েটারের উদ্ভব কালের সে এক ক্লেদাক্ত ঘটনা ।

বিনোদিনী তাঁর আত্মকথায় লিখে গিয়েছেন “শীঘ্র শীঘ্র প্রস্তুতের জন্য রাত্র পর্যন্ত কার্য হইত । সকলে চলিয়া যাইতেন । আমি, গুর্মুখ বাবু আর দুএকজন রাত্রি জাগিয়া কার্য করাইয়া লইতাম” । থিয়েটার বাড়ি হল , কিন্তু গুর্মুখ রায় বা বিনোদিনীর অজান্তে গিরিশ বাবুরা সেই থিয়েটারের রেজিস্ট্রী করে নিলেন বি- থিয়েটার নয় ‘স্টার থিয়েটার’ নামে’ । বিনোদিনী তাঁর আত্মকথায় লিখে গিয়েছেন “আমি তখন একেবারে উহাদের হাতের ভিতর! আর আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই যে উহারা ছলনা দ্বারা আমার সহিত এমনভাবে অসৎ ব্যবহার করিবেন” । এই প্রবঞ্চনা সত্তেও থিয়েটারের প্রতি তাঁর ভালোবাসার জন্য বিনোদিনী স্টার থিয়েটারেই থেকে গিয়েছিলেন । ১৮৮৩র ২১শে জুলাই স্টার থিয়েটারের উদ্বোধন হয় গিরিশ চন্দ্রের ‘দক্ষযজ্ঞ’ নাটক দিয়ে , সতীর ভুমিকায় বিনোদিনী । মাত্র ছয়মাস পরেই অসুস্থতা ও পারিবারিক চাপে গুর্মুখ থিয়েটার ব্যবসা ত্যাগ করেন । গুর্মুখ চেয়েছিলেন যার জন্য তিনি থিয়েটার বানিয়েছিলেন সেই বিনোদিনীকে থিয়েটারের স্বত্ব দিয়ে যেতে । এবারেও গিরিশ বাবুরা বাধা দিলেন । সরলমতী থিয়েটারে নিবেদিতপ্রাণা বিনোদিনী আবারও বঞ্চিত হলেন । মাত্র এগারো হাজার টাকায় স্টার থিয়েটার কিনে নিয়েছিলেন অমৃতলাল মিত্র, দাশুচরণ নিওগীরা । কেন এই প্রতারনা ? সেকালের নাট্যরথীরা বলেছিলেন এক বারাঙ্গনা কন্যার নামে থিয়েটার সেযুগের সমাজ মেনে নিত না , থিয়েটার চলতো না ।

অথচ এই বারাঙ্গনা কন্যার অভিনয়ই সেদিন বাংলা থিয়েটারকে মর্যাদামন্ডিত করেছিল । ১৮৮৪’র ২রা অগস্ট গিরিশচন্দ্রের ‘চৈতন্য লীলা’য় নিমাই চরিত্রে বিনোদিনীর অভিনয় দেখে শ্রীরামকৃষ্ণ দেব ভাববিহ্বল হয়ে পড়েন, বিনোদিনীর মস্তক স্পর্শ করে আশির্বাদ করেন । থিয়েটারে অশুচিতার বেড়া ভেঙ্গে যায় । ১৮৮৬র ১৬ই অগস্ট রামকৃষ্ণ দেবের মৃত্যু , আর তার চারমাস পরেই একরাশ ক্ষোভ ও যন্ত্রণা নিয়ে অভিনয় খ্যাতির শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করেও ১৮৮৭র ১লা জানুয়ারী থিয়েটার ত্যাগ করেন মাত্র ২৩ বছর বয়সে । আর ফিরে আসেন নি । বিস্ময়ের কথা, মঞ্চ ত্যাগের পর আরো পঞ্চান্ন বছর বেঁচে ছিলেন বিনোদিনী । বৃদ্ধ বয়সেও স্টারে থিয়েটার দেখতে আসতেন । কিন্তু গিরিশবাবুরা এই অসামান্য অভিনয় শিল্পীকে মঞ্চে ফিরিয়ে আনার কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেন নি । আসলে বিনোদিনীর অসামান্য অভিনয় প্রতিভা ও প্রবল ব্যক্তিত্ব সেকালের নাট্যরথীরা উপেক্ষাই করতে চেয়েছিলেন ।

সেকালের সব অভিনেত্রীই আসতেন বারাঙ্গনা পল্লীথেকে, যারা সকলেই বাংলা থিয়েটারে নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গিয়েছেন, বাংলা থিয়েটারকে মর্যাদামন্ডিত করেছেন, তাদের প্রাপ্য মর্যাদাটুকুও এই সমাজ দেয় নি । গিরিশচন্দ্রের মৃত্যুর পর তাঁর মৃতদেহে মালা দেবার অধিকারটুকুও তাদের দেওয়া হয়নি ।

বিনোদিনী সংসার করতে চেয়েছিলেন । তার গর্ভে পিতৃপরিচয়হীন যে কন্যাসন্তান জন্ম নিয়েছিল, বিনোদিনী তার নাম রেখেছিলেন শকুন্তলা । থিয়েটার ত্যাগ করার পর জনৈক সমভ্রান্ত জমিদার বিনোদিনীকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছিলেন এবং তাঁর আশ্রয়েই দাম্পত্য জীবনেরও স্বাদ পেয়েছিলেন । কিন্তু বিনোদিনী কোনদিন সেই মানী ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করেন নি । যেমন, তিনি যে বারাঙ্গনা কন্যা সে কথাও তাঁর আত্মজীবনীতে গোপন করার কোন চেষ্টা করেন নি ।

রঙ্গালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগের ছাব্বিশ বছর পরে,তখন তাঁর বয়স ৪৯ বছর বিনোদিনী তাঁর আত্মজীবনী । ‘আমার কথা’ গ্রান্থাকারে প্রকাশ করেন । তার আগে এবং পরেও বিনোদিনীর লেখনি চর্চা অব্যাহত ছিল । প্রকাশ করেছিলেন এবং বাসনা এবং ‘কনক ও নলিনী’ নামে দুটি কাব্যগ্রন্থ । কিন্তু বাংলা সাহিত্যের  প্রথম মহিলা আত্মজীবনী লেখিকার মর্যাদা কিংবা দুটি কাব্যগ্রন্থের লেখিকার মর্যাদা বিনোদিনী পান নি । বারারাঙ্গনা কুলোদ্ভবা যে !

বিনোদিনীর কন্যা সন্তানকেও সমাজপতিরা বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে বাধা দিয়েছিলেন, সমাজের মানী লোকেরা তাঁর অভিনয় দেখার জন্য রাতের পর রাত প্রেক্ষাগৃহে ছুটে যেতেন, তাঁকে ধন্যধন্য করতেন । কিন্তু তখনকার সমাজের মানী লোকেরা তার কন্যাকে বিদ্যালয়ে ভর্তিতে বাধা দিলেন । বিনোদিনী পারেননি তার কন্যা শকুন্তলাকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে । আত্মকথায় বিনোদিনী এক যায়গায় একটি বাক্য লিখেছিলেন “নারীর নিস্তার নাই টলিলে চরণ” । না সেদিন ছিল না, আজও নেই ।

৭৯বছর বয়সে ১৯৪১এর ১২ই ফেব্রুয়ারি জন্মস্থান ১৪৫নম্বর কর্নোয়ালিশ স্ত্রীটের বাসায় নিভৃতে তাঁর মৃত্যুকালে বাঙালির সমাজ যদিও অনেক উদার, কিন্তু অন্ধকার জগত থেকে উঠে আসা , আমাদের থিয়েটারের নির্মাণে অসামান্য অবদান রেখে যাওয়া এক নটীর মৃত্যুতে কোন শোকসভা হয়নি । কোন সংবাদপত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল কি না জানা নেই । তাঁর একটি কবিতার পংক্তিতে “স্মৃতি হ’তে বিস্মৃতিতেই অধিক সন্তোষ” মনে করেছিলেন বিনোদিনী । দেড়শ বছর পর আমরা কিন্তু ইতিহাসের সেই ছিন্নপত্র সন্ধান করে বেদনাহত হয়ে যাই ।   

                                               =============

 

 

বাংলা থিয়েটারের পথ চলা – সমকালীন সমাজ ও সময়

 বাংলা থিয়েটারের পথ চলা – সমকালীন সমাজ ও সময়

 

মধ্যযুগ পেরিয়ে আধুনিক যুগের শুরুতেও লোকনাট্যের মধ্যে ভারতীয় নাট্যকলার শিকড় ছিল । লোকগান, কবিগান, রামযাত্রা, আখড়াই ইত্যাদির মধ্যে নাট্য উপাদান ছিল । কিন্তু আধুনিক যুগে  সেই শিকড় থেকে আমাদের নাটক ও মঞ্চের উদ্ভব হল না ঔপনিবেশিক শাসনের কারণে । আমাদের থিয়েটারের উদ্ভব হল ইউরোপীয় ভাবনার অভিঘাতে ।

২৭শে নভেম্বর – ক্যালেন্ডারের একটি দিন, বিস্মৃতপ্রায়ও বটে । কিন্তু বাঙালির সামাজিক ইতিহাসের এক তাৎপর্যময় দিন । আজ থেকে ঠিক দুশো কুড়ি বছর আগে ১৭৯৫এর এই দিনটিতে বাঙালির প্রথম নাট্যাভিনয় । বাংলা থিয়েটার ও বাংলা ভাষায় নাট্যাভিনয়ের সূচনাও এই দিনটিতে ।

১৭৯৫ – নগর কলকাতার বয়স তখন সবে একশো বছর । নগরায়ন শুরু হয়েছে ধীর গতিতে । জঙ্গল, বাদা, ধানখেত ঘেরা কাঁচা মেঠো রাস্তা । একটাও চওড়া রাস্তা নেই, বিদ্যুতের আলো আসেনি, সংবাদপত্র দূরের কথা ছাপার যন্ত্রও আসেনি । যানবাহন বলতে পালকি । কিন্তু থিয়েটার এসেছিল । নগর কলকাতার প্রতিষ্ঠার পঞ্চাশ/ষাট বছরের মধ্যেই ইংরেজরা তাদের বিনোদনের জন্য তৈরি করেছিল ‘চৌরঙ্গী থিয়েটার’ । কিন্তু বাংলা ভাষায় নাটক লেখা বা অভিনয় করার কথা ভাবতে পারেননি কেঊই । ভাববেনই বা কি করে ! বাংলা গদ্যের জন্মই তো হয়নি ! ভেবেছিলেন একজন বিদেশী – গেরেসিম স্তিফানোভিচ লেবেডফ । তিনিই সূচনা করেছিলেন বাংলা ভাষায় প্রথম নাট্যাভিনয় ।

রুশ যুবক লেবেডেফ পর্যটক হিসাবে কলকাতায় এসেছিলেন ১৭৮৫তে । বেহালা বা ভায়োলিন বাদনে তাঁর পারদর্শিতা ছিল । কলকাতায় আকর্ষিত হন বাংলা ভাষার প্রতি । দশ বছর কলকাতায় থেকে জনৈক শিক্ষক গোলকনাথ দাসের কাছে বাংলা ভাষা শিখে একটি প্রহসন ‘দি ডিসগাইস’এর বাংলা অনুবাদ করলেন ‘কাল্পনিক সঙ বদল’ নামে । অভিনীত হল ২৫নম্বর ডোমোটোলায় (এখনকার এজরা স্ট্রীট), মাচা বেঁধে ‘বেঙ্গলি থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠা করে । বাংলা থিয়েটারে নারীর অভিনয়ের সূচনাও হল এই দিনে । গোলকনাথের সহায়তায় তিনজন বারাঙ্গনা কন্যাকে সংগ্রহ করেন লেবেডফ । কিন্তু সেদিনের অভিনেতা অভিনেত্রীদের বা লেবেডফের প্রধান সহায়ক গোলকনাথ দাস সম্পর্কে আর কিছুই জানা যায়না । জানা যায়না কেমন ছিল সেই সূচনালগ্নের বাংলা অভিনয় । কলকাতা থেকে বিতাড়িত হয়ে ফিরে গিয়ে বন্ধু সাম্বারাস্কিকে এক পত্র লিখেছিলেন লেবেডফ । লিখেছিলেন – “আমার বহুবিধ পরিশ্রমের মধ্যেও আমি নিরুৎসাহী ভন্ড ও বণ্য প্রকৃতির বাঙালিদের হাস্যরসাত্মক অভিনয় আয়োজন করিয়াছিলাম” । বাঙালির সেই প্রথম নাট্যাভিনয় উপলক্ষে লেবেডফ যে প্রচারপত্র বা বিজ্ঞপ্তি প্রচার করেছিলেন সেটিরও উল্লেখ করছি এর ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্য । কারণ এটি আদি কথ্য বাংলা ভাষার নমুনাও বটে । তখনও বাংলা গদ্যের সূচনা হয়নি, বানানের শুদ্ধতা বা যতি চিহ্ন ব্যবহারের কোন বালাই ছিল না । সেই বিজ্ঞাপনটি অবিকৃত উদ্ধার করলাম –

“গবর্ণর জেনারেল অনুমতি প্রমান –

লেবেডফ মহাশএর

নওব নাচঘর নং ২৫ ডোমতলার পথে –

এক বাঙালি সংবদোল নামে প্রকাস করা হইবেক –

কাল নাচ হইবেক এই মাহ ১৪ অগ্রহায়ন ইংগরাজি ২৭ নবার

বেলাতি আর বাঙালি জনত্রের সহিত গিতবাদ্য হইবেক –

শ্রী ভারতচন্দ্র রায়ের কবিতা জনত্রের গান হইবেন –

নিচের বারান্দা ও ঘরের ভিতর সিককা ৮

উপরে বারান্দা ৮

নাচের টীকিট নাচঘরে পাওয়া যাইবেক’

এই দিনটির  - অর্থাৎ লেবেডফের বেঙ্গলি থিয়েটারের প্রতিষ্ঠা ও বাঙ্গালির প্রথম নাট্যাভিনয়ের সূচনার আরো কয়েকটি ঐতিহাসিক তাৎপর্য আছে । (১) আমরা জানতে পারলাম নাট্যাভিনয়ে পুরুষ ও নারী সমবয়সী (২) বিনোদন সর্বসাধারণের উপভোগের বস্তু – শুধুমাত্র বিত্তশালীদের নয় । এবং (৩) আমরা জানতে পারি আদি বাংলা গদ্যভাষার নমুনা । টিকিট কেটে এবং পুরুষের সঙ্গে মেয়েদের নিয়ে নাট্যাভিনয় হল, ইতিহাসে স্থান পেলো বটে কিন্তু বাঙালির সেই প্রথম নাট্যাভিনয় আমাদের পরবর্তী নাট্য রচনা ও অভিনয়ের বিবর্তনে স্থায়ী ছাপ রেখে গেলো না। কারণ সে অভিনয়ের বিশেষ কোন লেখাজোখা পাওয়া যায় না, কলকাতা থেকে ফিরে গিয়ে বন্ধু সাম্বারাস্কিকে একটি পত্রে কিছু বিবরণ লিখে গিয়েছিলেন, এই যা । অভিনয়যোগ্য মৌলিক বাংলা নাটক লেখা হল আরো ৬৩ বছর পরে । রামনারায়ণ তর্করত্ন লিখলেন অভিনয়যোগ্য প্রথম বাংলা নাটক ‘কুলীন কুলসর্বস্ব’- অভিনীত হল ১৮৫৮তে । অভিজাত জমিদার বাবুরা তাদের গৃহপ্রাঙ্গণে নাট্যমঞ্চ প্রতিষ্ঠা করলেন । সেইসব অভিনয়ে সাধারণ মানুষের অবাধ প্রবেশাধিকার থাকতো না। বাংলা নাটক বন্দী হল জমিদারবাবুদের প্রাঙ্গণে । সেখান থেকে বাংলা নাটক উদ্ধার পেল ১৮৭২এর ৬ই ডিসেম্বর বাঙালির প্রথম সাধারণ রঙ্গালয় ন্যাশানাল থিয়েটারের প্রতিষ্ঠা ও ‘নীলদর্পণ’ নাটকের মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে । লেবেডফের ‘বেঙ্গলি থিয়েটারে’র পর বাঙালি প্রতিষ্ঠিত প্রথম প্রসেনিয়াম থিয়েটার হল প্রসন্ন কুমার ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত ‘হিন্দু থিয়েটার’ ।

বাঙালির সেই প্রথম নাট্যাভিনয় - লেবেডফের নাটকের সংলাপের গদ্যভাষা খুব প্রাঞ্জল ছিল না, থাকার কথাও নয় । কারণ লিখিত বাংলা গদ্যের আবির্ভাব হয়েছিল আরো বেশ কয়েক বছর পরে । বাংলা গদ্যের জনক রামমোহন রায় তখন ২৩ বছরের তরুণ, গদ্য লেখা শুরু করেননি, কলকাতাতেও আসেননি । ১৮০০সনে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার পর কেরি সাহেবের উদ্যোগে অল্প-সল্প পাঠ্য গদ্য লেখা শুরু হয় । সুতরাং ১৭৯৫ সনে লেবেডফের সামনে নাটক তো বটেই বাংলা গদ্যেরও কোন আদর্শ ছিল না । গবেষকদের অনুমান মৌখিক কথ্যভাষা মুখে মুখে শুনে আয়ত্ব করেছিলেন লেবেডফ এবং তাঁর নাটকে লোকের মুখের ভাষাই গ্রহণ করেছিলেন । নাট্য ঐতিহাসিক ড:অজিতকুমার ঘোষ মন্তব্য করেছেন “প্রসেনিয়াম থিয়েটারের সংলাপাশ্রিত ক্রিয়া প্রধান, সুসংবদ্ধ কাহিনিযুক্ত নাটকের প্রথম নিদর্শনরূপে নাটকটির মূল্য রয়েছে । ......বাস্তবধর্মী গদ্য নাট্য সংলাপের ভাষার নিদর্শনরূপে এই নাটকের ভাষার যেমন গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি তখনকার ভাষায় কী ধরনের শব্দ ও বাগ্বিধির প্রয়োগ হত তারও নিদর্শনরূপে এর গুরুত্ব কম নয়” । ... লেবেডফ তাঁর বন্ধুকে পত্রে জানিয়েছিলেন “দর্শকবৃন্দ অকপটভাবে ইহাতে পরিতৃপ্তি পাইয়াছিল, কেবল কর্মিবৃন্দই বুঝিতে পারিয়াছিল যে হিন্দুস্থানী ভাষার শিক্ষকগণ ও অনুবাদকগণ আমার উপর ক্রুদ্ধ হইয়াছিলেন” ।

সেকালের ইংরাজ সহায়ক সম্ভ্রান্ত শ্রেনিটি, সমাজপতিরা লেবেডফ ও বাঙালির সেই প্রথম নাট্যাভিনয়ের প্রতি মোটেই সুপ্রসন্ন ছিলেন না । কেন না থিয়েটার ও নাট্যাভিনয় তখন ছিল তাঁদের বিধানে নিষিদ্ধ বস্তু । শেষ পর্যন্ত ইংরেজরা তাদের প্রতিদ্বন্দি ভেবে লেবেডফের থিয়েটারে আগুন ধরিয়ে ধ্বংস করে দেয় । দেনায় জড়িয়ে লেবেডফকে দেউলিয়া ঘোষণা করে দেশ থেকে বিতাড়িত করে ১৭৯৭ সনে । তাতে ইতিহাসকে আর কি করে মোছা যায় ? ইতিহাস তার শরীরে সমাজ বিকাশের সব বৃত্তান্তই ধরে রাখে । বিদেশী যুবক গেরেসিম লেবেডফ তাই জড়িয়ে আছেন বাংলা নাট্যসংস্কৃতির পিতৃপুরুষ রূপে । স্মরণীয় হয়ে আছে ২৭শে নভেম্বর ১৭৯৫এর দিনটি ।

আমাদের নাট্য-ইতিহাসে আর একটি স্মরণীয় দিন হল ৭ই ডিসেম্বর ১৮৭২, যে দিন সাধারণ মানুষের কাছে রঙ্গালয়ের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিল, যে দিনটিতে পথ চলা শুরু করেছিল আমাদের সাধারণ নাট্যশালা, আর যে ধারাবাহিকতা আজও প্রবহমান নানা ভাঙ্গা-গড়ার মধ্য দিয়েও ।  

হঠাৎ একদিন সাধারণ রঙ্গালয় গড়ে ওঠেনি, পেছনে আছে তার বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস । ইংরাজরা সহ্য করতে পারলো না লেবেডফের থিয়েটারকে ।  সেকালের সমভ্রান্ত বিত্তশালীরাও লেবেডফের প্রতি বা তার থিয়েটারের প্রতি সুপ্রসন্ন ছিলেন না । সাধারণ অনভিজাত লোক বিনোদনের আনন্দতে ভাগ বসাবে – এটা তাদের ‘না-পসন্দ’ ছিল । এর পর  ১৮৩১ সনের আগে বাঙালির আর কোন নাট্য প্রয়াস বা উদ্যোগ ছিল না ।

লেবেডফ পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে শিক্ষিত বাঙালীর মননে, সৃজনে যুগান্তকারী বদল ঘটে গেছে । ইতিমধ্যে ১৮১৭ সনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হিন্দু কলেজ, ১৮১৫তে রামমোহন রায় কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন, বাংলা সংবাদ পত্রিকার প্রকাশনা শুরু হয়েছে ১৮১৮ সন থেকে,  শুরু হয়েছে পুস্তক প্রকাশনা । ১৮২৬’এ হেনরী ভিভিয়ান ডিরোজিও হিন্দু কলেজে শিক্ষকতায় এসেছেন ১৮২৬এ, ১৮২৯শে প্রবর্তিত হয়েছে সতীদাহ নিবারণ আইন । ১৮৩০এ বিদ্যাসাগর বীরসিংহ গ্রাম থেকে এসে কলকাতার বড়বাজারে রাইমণি দেবীর বাড়িতে তখন ১০ বছরের বালক । ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালির জীবনে লেগেছে দোলা । অন্যদিকে, ইংরাজদের লঘু রসাত্মক নাট্যাভিনয় দেখে বাঙালি বিত্তশালী বাবুরাও নতুন ধরনের আমোদের সন্ধান পেলেন । দেশীয় ধারার বিনোদনের পরম্পরা – যাত্রা, কবিগান,আখড়াই তখন তাদের কাছে ব্রাত্য । ইউরোপীয় ধরণের নাট্যাভিনয়ের জন্য বাবু প্রসন্নকুমার ঠাকুর তাঁর গৃহপ্রাঙ্গণে প্রপ্তিষ্ঠা করেন ‘হিন্দু থিয়েটার’ । তখনও কোন মৌলিক বাংলা নাটক লেখা হয়নি, সে আগ্রহও প্রসন্নকুমার ঠাকুরদের ছিল না । তাদের হিন্দু থিয়েটারে অভিনীত হয়েছিল ইংরাজী নাটক । এই সঙ্গেই শুরু হয় বিত্তশালী জমিদার বাবুদের গৃহপ্রাঙ্গণে বা বাগানবাড়িতে নাটক ও নাট্যাভিনয়ের বন্দীত্ব । সেই থিয়েটারে অনভিজাত সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার থাকতো না । ইংরাজি ভাষায়, কিংবা সংস্কৃত নাটকের অনুবাদ নাট্যাভিনয় হত, বাংলার সমাজজীবনের কোন প্রতিফলন যেমন থাকতো না সেইসব নাটকে তেমনই সাহিত্যগুনান্বিত মৌলিক বাংলা নাটকও লেখা হত না ।

১৮৫৮তে বাংলার নাট্যক্ষেত্রে প্রবল আবির্ভাব হল মধুসূদন দত্তর ‘শর্মিষ্ঠা’ নাট্য রচনার মধ্য দিয়ে । মহারাজা যতীন্দ্রমোহন সিংহর বেলগাছিয়া নাট্যশালায় অভিনীত হ’ল ১৮৫৯এ । এলেন দীনবন্ধু মিত্র, ১৮৬০এ লিখলেন ‘নীলদর্পণ’ ।

১৮৬৮তে প্রতিষ্ঠিত হল বাগবাজার অ্যামেচার থিয়েটার । এই সংগঠনের মধ্যেই নিহিত ছিল বাঙালির সাধারণ নাট্যশালা গঠনের বীজ । বাগবাজারের কিছু উৎসাহী যুবক – অর্ধেন্দু শেখর মুস্তাফি, রাধামাধব কর, নগেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, গিরিশচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ নাট্যদল গঠন করে অভিনয় করলেন দীনবন্ধু মিত্রর ‘সধবার একাদশী’ । ১৮৭২এর ১১ই মে তাদের দ্বিতীয় নাটক ‘লীলাবতী’ অভিনীত হয় এবং আশাতীত সাফল্য লাভ করে । লীলাবতীর সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে নিয়মিত নাট্যাভিনয়ের লক্ষ্যে একটি ‘সাধারণ নাট্যশালা’ প্রতিষ্ঠার কল্পনা করেন তাঁরা, যেখানে বিত্তশালীদের কৃপাপ্রার্থী না হয়ে টিকিট বিক্রয় করে সর্বসাধারণকে নাট্যাভিনয়ের প্রতি আকর্ষণ করা যাবে ।

অর্ধেন্দুশেখর, অমৃতলাল বসুদের কল্পনা বাস্তবায়িত হল - প্রতিষ্ঠিত হল আমাদের সাধারণ রঙ্গালয়। চিৎপুরে মধুসূদন সান্যালের গৃহপ্রাঙ্গণ ৩০টাকায় ভাড়া নিয়ে মঞ্চ নির্মাণ করে প্রতিষ্ঠিত হল ‘ন্যাশানাল থিয়েটার’ । ১৮৭২ সনের ৭ই ডিসেম্বর দ্বারোদ্ঘাটন হল বাংলার সাধারণ নাট্যালয় দীনবন্ধু মিত্রর নাটক ‘নীলদর্পণ’ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ।

খুব মসৃণ ভাবে যে এটা হয়েছিল তা নয় । টিকিট বিক্রয় করে ন্যাশানাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠার প্রবল বিরোধিতা করে গিরিশচন্দ্র ঘোষ এই উদ্যোগ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে দলত্যাগ করেছিলেন, এমনকি ছদ্ম নামে সংবাদপত্রে এই উদ্যোগের নিন্দাবাদও করেছিলেন । গিরিশচন্দ্র নিজেই লিখেছেন ... “সাধারণের সন্মুখে টিকিট বিক্রয় করিয়া অভিনয় করা আমার অমত ছিল । ...কয়েকজন গৃহস্থ যুবা একত্র হইয়া ক্ষুদ্র সরঞ্জামে ন্যাশানাল থিয়েটার করিতেছে, ইহা বিসদৃশ জ্ঞান হইল । এই মতভেদ” (বঙ্গীয় নাট্যশালা – ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়) । টিকিটের মূল্য ছিল – প্রথম শ্রেনিতে একটাকা আর দ্বিতীয় শ্রেণীতে আঠ আনা । প্রথম অভিনয়ের টিকিট বিক্রয় হয়েছিল চারশো টাকার । ‘নীলদর্পণ’ অভিনয় তখনকার সমাজে কিভাবে আলোড়িত করেছিল তা এখানে আলোচ্য নয় । সাধারণ রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ প্রসংশিত হয়েছিল । ১২ই জানুয়ারী ১৮৭২, অমৃতবাজার পত্রিকা লিখেছিল ...” নীলদর্পণের অভিনেতৃগণ সমাজবদ্ধ হইয়া এই অভিনয়কর্ম সম্পাদন করিতেছেন । তাঁহারা টিকিট বিক্রয় করিতেছেন ও সেই অর্থে অভিনয়সমাজের উন্নতি ও পুষ্টিসাধন করিবেন মানস করিয়াছেন আমরা একান্ত মনে তাঁহাদের মঙ্গল প্রার্থনা করিতেছি”...।

    সেই শুরু আমাদের পেশাদারী মঞ্চ ও মঞ্চাভিনয়ের । নানা ভাঙা-গড়া,উথ্বান-পতন, শাসকের রক্তচক্ষু, বিরোধ-মিলনের সাক্ষি হয়ে, অর্ধেন্দুশেখর- অমৃতলাল - গিরিশচন্দ্র –অমরেন্দ্রনাথ দত্ত-বিনোদিনী- তারাসুন্দরী-প্রভা দেবী - শিশির ভাদুড়ি হয়ে যে ধারাবাহিকতা আজও বহমান । মধুসূদন দত্ত, দীনবন্ধু মিত্র, ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় মন্মথ রায় বিধায়ক ভট্টাচার্য কত নাট্যকার সমৃদ্ধ করেছেন আমাদের নাট্য ইতিহাসকে বিগত দেড়শো বছরে । শুরুটা হয়েছিল ১৮৭২এর ৭ই ডিসেম্বর ।

প্রাক-স্বাধীনতা কালে আমাদের নাট্য ঐতিহ্যে আর একটি যুগান্তকারী বাঁক এসেছিল ১৯৪৪এ । বিশ শতকের চল্লিশের দশকে মাঝামাঝিতে পেশাদারী মঞ্চে শুরু হয় ক্ষয়ের কাল । অর্ধেন্দুশেখর-গিরিশ-অমরেন্দ্র যুগের শেষ প্রতিনিধি শিশিরকুমার ভাদুড়ী তখন পেশাদারী মঞ্চের ‘নিঃসঙ্গ সম্রাট’ । ১৯৪০এর দশকটা ছিল এক উত্তাল সময় । দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ শুরু হয়েছে ১৯৩৯এ । যুদ্ধের অনিবার্য পরোক্ষ ফল নিষ্প্রদীপ বাংলায় কালোবাজারি, মজুতদারি আর সাধারণ মানুষের হতাশা, বেকারি, দারিদ্র, মনুষ্যত্বের লাঞ্ছনা । বিয়াল্লিশে স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায় ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হয়েছে । ১৯৪৩এ দেখাদিল মানুষের তৈরি ভয়ঙ্করতম মন্বন্তর । কলকাতার রাস্তায় একটু ফ্যানের জন্য মৃত্যুমুখী মানুষের হাহাকার । পঁয়ত্রিশ লক্ষ্য মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল এই ভয়ঙ্করতম মন্বন্তরে । দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের এই সমস্ত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কার্যকারণে গড়ে উঠেছিল গণনাট্য সঙ্ঘ । লক্ষ লক্ষ মৃত্যু আর সামাজিক অবক্ষয়ের যন্ত্রণার গভীর থেকে জন্ম নিল এক এক সৃজনশীল সাংস্কৃতিক সংগ্রাম আর সেই সংগ্রামের অভিঘাতে জন্ম নিল এক নতুনতর নাট্যধারা,বলা ভালো নাট্য আন্দোলন – গণনাট্য আন্দোলন, ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের নেতৃত্বে । এই নতুনতর নাট্যধারার প্রথম পুরোহিত বিজন ভট্টাচার্য এলেন তাঁর ‘নবান্ন’ নাটকের মধ্য দিয়ে । বাংলা থিয়েটারে সে এক ক্রান্তিলগ্ন । গণনাট্য সঙ্ঘের প্রযোজনায় বিজন ভট্টাচার্য ও শম্ভূ মিত্রর যৌথ পরিচালনায় নাটকটি শ্রীরঙ্গম মঞ্চে অভিনীত হয় ১৯৪৪এর ২৪শে সেপ্টেম্বর । পূর্ববর্তী একশ’ বছরের সনাতনী নাট্য ও মঞ্চের প্রয়োগভাবনার ওলট পালট ঘটিয়ে ‘নবান্ন’ হয়ে গেল বাংলা নাটক ও মঞ্চের এক মাইলফলক । আজও অসংখ্য গ্রুপ থিয়েটার সেই ধারারই উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে । ‘নবান্ন’র নাট্যনির্মাণ এনেছিল নতুনতর নাট্যভাষা । সনাতনী ‘শিল্পের জন্য শিল্প’-অনুগত সাহিত্যভাবনা পরিবর্তিত হয়ে গেল নতুনতর স্লোগানে – ‘শিল্প হবে মানুষের জন্য’ । বিজন ভট্টাচার্যর কথায় “যে মানুষেরা রাস্তায় দুর্ভিক্ষের মড়া দেখে মুখ ফিরিয়ে গেছে  ‘নবান্ন’ নাটক দেখিয়ে সেই মানুষদের চোখে আমরা জল ঝরাতে পেরেছি - এটা ছিল আমাদের কৃতিত্ব” ।

এ জিনিস বাংলা নাট্যমঞ্চে আগে কখনও হয়নি । সেই উত্তাল সময়েও পেশাদারী থিয়েটারে বেশিরভাগ নাটকের কাহিনী ছিল প্রধানত পুরাণ, ইতিহাস, দেব-দেবী নির্ভর কাহিনী কিংবা মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত মানুষের মোটা দাগের গল্প । মাটির কাছাকাছি থাকা জনজীবনের কাহিনী প্রতিফলিত হ’ত না কোন নাটকেই । পীড়িত মানুষ যখন খাদ্যের জন্য হাহাকার করছে তখন পেশাদারী থিয়েটারে অভিনীত হচ্ছে ‘সীতা’, ‘আলমগীর’, ‘মিশরকুমারী’র মত নাটক  । এই নাট্যভাবনাকে চূরমার করে বিজন ভট্টাচার্য মঞ্চে নিয়ে এলেন শ্রমজীবি মানুষদের । আজকের প্রবহমান বাংলা থিয়েটার মূলত এই নাট্যধারাকেই বহন করে চলেছে ।

স্বাধীনতা-উত্তর সময়কালে পঞ্চাশের দশকে শম্ভূ মিত্রর বহুরূপী আমাদের নাটকের রবীন্দ্রনাথকে চেনালেন, পঞ্চাশেএর দশকে উৎপল দত্তর প্রবল উপস্থিতি তাঁর লিটল থিয়েটার গ্রুপের ‘অঙ্গার’ নাটকের মধ্য দিয়ে, ষাটে এলেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় । পঞ্চাশের দশক থেকে উঠে এলো অসংখ্য গ্রুপ থিয়েটার বাংলা থিয়েটারে যেন বিস্ফোরন ঘটে গেলো । সেই প্রসঙ্গ বা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা থিয়েটার আমার আলোচ্য নয় । আমি ফিরে দেখলাম, বুঝতে চাইলাম বাংলা থিয়েটারের উদ্ভব ও পথচলার কয়েকটি পর্ব সমকালীন সমাজ ও সময়ের প্রেক্ষিতে ।

       -----XXX--------

 

 

 

 

 

 

বাংলা গানের সেকাল একাল : পর্ব ১৬

  অন্য ধারার গান : গণসঙ্গীত ও সলিল চৌধুরী     গত শতকের চল্লিশের দশকে গণনাট্য আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আর একটি সঙ্গীতধারা সমৃদ্ধ করেছিল বাংলা কা...