যা হারিয়ে যায়
‘যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে রইবো কত আর’ ।
সত্যিই তো, যা হারিয়ে যায়, সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাবে
তাকে কে আর আগলে রাখতে চায় ! চাইলেও তা আগলে রাখা যায় না । তবুও থেকে যায় । থেকে
যায় আমাদের স্মৃতিতে, কাউকে বা স্মৃতিকাতর করে । ইট,কাঠ, লোহার কিছু ঐতিহ্যভবনকে
আগলে রাখার চেষ্টা হয় । রক্ষণের কাম্য দেখভাল হয়তো হয় না, তবুও আগলে রাখার
চেষ্টাটা তৃপ্তি দেয় বৈকি । অবশ্য কাদের জন্যই বা আগলে রাখা ! যদি আমাদের ঐতিহ্য
বা ইতিহাসবোধের অবশেষ কিছু না থাকে । ভাষাচার্য সুকুমার সেনের বর্ধমানের অত বড়
বাড়িটা কেমন বেমক্কা ঝলমলে অলঙ্কারের শোরুম হয়ে গেল ! সে কথা থাক । আমাদের ভাষাটাই
যখন উচ্ছন্নে যাবার পথে তখন ভাষাচার্যের ভবনটা হারিয়ে গেলে কার কি ?
একটা গানের কলি মনে পড়ে ‘স্মৃতি শুধু বেদনার’ । স্মৃতি কিছু বেদনাকে
ধরে রাখে ঠিকই, কিন্তু কত আনন্দ যে জড়িয়ে থাকে তার মধ্যে, আর ইতিহাস যেন পরম মমতায়
জড়িয়ে থাকে সেইসব স্মৃতির মধ্যে ! কে না জানে জীব ও জড় জগতের তাবৎ সৃষ্টি মধ্যেই
তার ধ্বংশের বীজও লুকিয়ে থাকে । হারিয়ে যাওয়া মানে তো
ধ্বংসই, আর ফিরে আসে না । ফিরে আসেনা বলেই তো স্মৃতিতে সাজানো থাকে পরতে পরতে ।
কেউবা হারিয়ে যায় নতুনতর
বন্দোবস্তকে যায়গা করে দিতে, কেউবা সরে যেতে বাধ্য হয় প্রযুক্তির অগ্রগতিকে মেনে
নিয়ে । নিমন্ত্রণ বাড়িতে মাছ, মাংস, রসগোল্লার বালতি কিংবা দইয়ের হাড়ি হাতে কোমরে
গামছা জড়ানো ছেলেরা আর ফিরে আসবেনা কিন্তু সেইসব দিনের স্মৃতি ফিকে হবার নয়, ফিরে
ফিরে আসে বারবার । হারিয়ে গেছে বিয়ে বাড়ির নহবতখানার সানাই । সেও আর ফিরবে না ।
স্মৃতিতে সদাই পিছুটান, টেনে
নিয়ে যায় পেছনে, ইতিহাসের কাছে । আর এই পিছুটানের উপাদান হল বিস্ময় । হারিয়ে যাওয়া
জিনিসের প্রতি মনের পরতে পরতে জমে থাকা স্মৃতির অনেকটাই তার সঙ্গে লেগে থাকা
বিস্ময় । ১৯০০/১৯০২ নাগাদ এসেছিল দম দেওয়া কলের গান বা গ্রামফোন আর গ্রামফোন
রেকর্ড তারপর মাত্র একশো বছরের মধ্যে নানান বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গালার চাকতির
গ্রামফোন রেকর্ড থেকে পৌছে গিয়েছি মাইক্রো চিপসে । সেই
দম দেওয়া কলের গানে রেকর্ডে গান শোনার মধ্যে ছিল বিস্ময়, তাই সেই স্মৃতি একশো
বছরেও মুছে যায় না । মাইক্রচিপসে গান শোনায় সে বিস্ময় নেই । আসলে
বিজ্ঞানের অগ্রগতি, তার নব নব প্রবর্তন আর আমাদের বিস্মিত করে না ।
কবি পূর্নেন্দু পত্রীর একটি কবিতার কয়েকটি পংক্তি মনে
পড়ে -
“স্মৃতি কি আমারও আছে ?
স্মৃতি কি গুছিয়ে রাখা আছে
বইয়ের তাকের মত,
লং প্লেইং রেকর্ড-ক্যাসেটে
যে-রকম সুসংবদ্ধ নথীভুক্ত
থাকে গান, আলাপচারীতা” ?
( স্মৃতি বড় উচ্ছৃঙ্খল –পুর্ণেন্দু পত্রী )
অনেক
স্মৃতি নিশ্চন্তে থরে থরে আলমারির তাকের মত সাজিয়ে রাখা যায় যার মধ্যে তার নাম ‘চিঠি’ । সেই চিঠিও প্রায়
হারিয়ে গেছে । চিঠি হারিয়ে গেছে কথাটা বলা হয়তো একটু ভুল । সে আছে অন্য চেহারায়, নানান
চেহারায় । আসলে চিঠি লেখার মানুষই আর নেই, হারিয়ে গেছে চিঠি লেখার মানুষ । ‘চিঠি’ শব্দটাকেই
যেন খেয়ে ফেলেছে প্রযুক্তি, শুধু রয়ে গেছে আমাদের রঙ্গীণ স্মৃতি । চিঠি নেই তাই
এমন কবিতা –গানই রচিত হবে কি করে ! মনে পড়ে কৈশোরে শোনা তুলসীদাস ছায়াছবির গান -
‘লিখিনু
যে লিপিখানি প্রিয়তমারে
সঞ্চিত
কত ব্যথা কত মধু ভালোবাসা
নারিনু
পাঠাতে হায় স্মরণপারে...’
কিংবা
জগন্ময় মিত্র গীত গান ‘চিঠি’ ।
চিঠি
লেখা মানুষের প্রাচীনতম প্রবৃত্তি । সেই প্রবৃত্তি যে শেষ হয়ে গেছে তেমন নয় । হাতে লেখা চিঠি
দেওয়া বা পাওয়ার মধ্যে যে তৃপ্তি, যে রোমাঞ্চ হারিয়ে গেছে সেটা । ভাবতে ইচ্ছে করে
তখন যদি বৈদ্যুতিন প্রযুক্তি ইমেইলের প্রচলন থাকতো, তাহলে কি রবীন্দ্রনাথের
পত্রসাহিত্য কিংবা জওহরলাল নেহেরুর ‘ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’ আমরা পেতাম ?
হাতেলেখা
চিঠি নেই, হারিয়ে গেছে লাল ডাকবাক্স । ডাকঘরগুলো হয়ে যাচ্ছে টাকা লেনদেনের ব্যাঙ্ক
। নির্জন পথে ঝুমঝুম ঘন্টা বাজিয়ে ছুটে চলা ‘রানার’ এখনও বেঁচে আছে সুকান্তর
কবিতায়, হেমন্তের গানে । চিঠি বিলি করা মানুষটিকে ঘিরে আমাদের কতই না স্মৃতি, সাহিত্য-সঙ্গীত-সিনেমায়
কতই না উজ্বল হয়ে আছেন তারা ! সেই কিশোরবেলায় কে না চোখে বিস্ময় নিয়ে ছুটে গেছি
সাইকেলে ঘন্টা বাজিয়ে আসা ডাক বিলিকরা মানুষটির কাছে । সদ্যবিবাহিতা তরুণী জানালার
গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে থাকা, ডাক বিলি করা সেই লোকটির জন্য ! চিঠি হারিয়ে গেলেও তারা
হারিয়ে যান নি, বেঁচে আছেন, থাকবেন আমাদের স্মৃতিতে, রবীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্করদের
গল্পে, সত্যজিতের সিনেমায় ।
আসলে
বিজ্ঞান ও নব নব প্রবর্তন ব্যক্তি বা সামাজিক জীবনকে করে দিয়েছে যান্ত্রিক ।
আত্মীয়তা, আন্তরিকতা, মেলামেশার আনন্দটার দখল নিয়েছে অর্থ । তবুও জীবনের
যান্ত্রিকতায় এইসব ‘হারানিধি’র জন্য অন্তরের বেদনা বোধ ততটা করি না, ক্ষণিকের
বিষন্নতা হয়তো থাকে । কিন্তু ভালোবাসা হারিয়ে গেলে বাকি থাকে কি ? জীবনের
যান্ত্রিকতায় আজ যে অমূল্য বোধটিকে হারিয়ে ফেলছি তা হল ভালোবাসা । ভালোবাসা হারিয়ে
গেলে আলগা হয় পারিবারিক বাঁধন, সমাজের বন্ধন । ভালোবাসা – তাকে আগলে রাখতে হয়, কিন্তু
পারছি না। । একুশ শতকের প্রায় এক চচুর্থাংশ পার করে যদি হাহাকার করি ‘ভালোবাসা’ আবার
ফিরে এসো । আসবে কি ? কি উত্তর পাবো জানি না ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন