কথা না বলা যুগের সিনেমাকথা
আমাদের প্রধান শিল্পমাধ্যমগুলির মধ্যে সিনেমা
বা চলচ্চিত্র হচ্ছে নবীনতম । মানুষ কবে কোন গুহাকন্দরে পাথর খোদাই করে
ছবি এঁকেছিল, কিংবা কবে সে মনের আনন্দে গান গেয়েছিল তা আমরা জানি না, জানি না কে কবে প্রথম কবিতা
রচনা করেছিল । কিন্তু চলচ্চিত্রের জন্মদিন কবে
তা আমরা জানি । আর জানি চলচ্চিত্র হচ্ছে সেই আশ্চর্য শিল্প যার মধ্যে সাহিত্য, সঙ্গী্ত
নাট্যকলা, চিত্রকলা – সমস্ত শিল্পের সম্মিলন ঘটেছে । চলচ্চিত্র নিয়ে আজ মানুষের
আগ্রহের শেষ নেই কত মানুষের কত শ্রম আর পরীক্ষা নিরীক্ষার পথ বেয়ে আজ চলচ্চিত্র
আমাদের বিনোদন মাধ্যমের শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেছে, সেসব কথা ইতিহাসে লেখা আছে । বাংলা
সিনেমাও বিশ্ব চলচ্চিত্রের আসরে সম্মানের যায়গায় পৌঁছে গেছে অনেকদিন আগেই ।
চলচ্চিত্রের ইতিহাস লেখা আমার উদ্দেশ্য নয় । আমি যেতে চেয়েছি ভারতীয় চলচ্চিত্রে
শিকড়ের কাছে, বুঝতে চেয়েছি বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের উদ্ভাবন ও শৈশব পর্বের তিন
কৃতি মানুষের জীবন ও কর্মকে যাদের সামান্য অবদান ভারতীয় চলচ্চিত্রকে এই যাগায় নিয়ে
এসেছে । তাঁরা হলেন হীরালাল সেন, ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ও
বীরেন্দ্রনাথ সরকার । হীরালাল ভারতীয় চলচ্চিত্রশিল্পের জনক, ধীরেন্দ্রনাথ বা ডিজি
ছিলেন নির্বাক থেকে সবাক যুগে বাংলা সিনেমার আদিপর্ব পর্যন্ত ভারতীয় চলচ্চিত্রের
প্রাণপুরুষ আর বীরেন্দ্রনাথ সরকার সিনেমার নির্মাণ, বিপণন ও প্রদর্শনএর ক্ষেত্রে
ছিলেন কর্মপুরুষ বাংলা সিনেমার প্রাণকেন্দ্র নিউ থিয়েটার্স স্টূডিওর প্রতিষ্ঠাতা ।
সেকালে বাংলা ও হিন্দি সিনেমা মানেই ছিল নিউ থিয়েটার্স । ভারতীয় চলচ্চিত্রে উদ্ভব,
বিকাশের ক্ষেত্রে এই তিনজনের অসামান্য অবদান রয়েছে । এই তিন কৃতি মানুষের কথাই বলি
। এই লেখা শুধুমাত্র তিন কৃতি মানুষের জীবন ও কর্মের বৃত্তান্তই নয়, বাংলা সিনেমার
উদ্ভব ও বিবর্তনের একটা স্পষ্ট ছবিও আমি বোঝার চেষ্টা করেছি ।
হীরালাল সেন – উপমহাদেশের
চলচ্চিত্রের জনক
আজ থেকে একশো বছর আগে অক্টোবরের ২৮ তারিখে প্রয়াত হয়েছিলেন উপ
মহাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের জনক হীরালাল সেন মাত্র ৫১ বছর বয়সে । আজ ভারতীয়
চলচ্চিত্র নিয়ে আমাদের কত গর্ব-গৌরব, কত কৃতিত্বের অহংকার, কিন্তু এ দেশে চলচ্চিত্রশিল্পের উদ্ভাবক মানুষটিকেই
তলিয়ে দিয়েছি বিস্মৃতির অতলে । জন্মদিন-মৃত্যুদিনে তাঁর ছবিতে ফুলমালা চড়ে না, তাঁর
স্মৃতিতে কোন চলচ্চিত্র পুরস্কার দেওয়া হয় না। তিনি শুধু থেকে গেছেন ইতিহাসের
পৃষ্ঠায় আর কিছু মানুষের গবেষণাপত্রে । ‘কথা না বলা যুগের সিনেমাকথা’র প্রথম পর্ব
তাই হীরালাল সেনের প্রয়াণ শতবর্ষের স্মরণগাথাও বটে । এম
কোন প্রশ্নোত্তরী বা কুইজের আসরে ‘ভারতের চলচ্চিত্রশিল্পের
জনক কে?’ এমন প্রশ্ন করলে অবধারিত উত্তরে আসবে দাদাসাহেব ফালকের নাম
। সঞ্চালকও হয়তো উত্তরটাকে সঠিক বলে দেবেন । এদেশে এমনই হয় ! মিথ্যা বা
অর্ধসত্যকেই সত্য বলে প্রতিপন্ন করার সচেতন প্রয়াস হয় প্রভাবশালী মহলের দ্বারা ।
তাঁরা দাদাসাহেব ফালকেকেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনক বলে প্রচার করেন । ফালকের তোলা
প্রথম চলচ্চিত্র ‘রাজা হরিশচন্দ্র’ এখনও সংরক্ষিত আছে আর হীরালালের তোলা সমস্ত
চলচ্চিত্র ও তাঁর স্টুডিও বিধ্বংসি আগুনে ভস্মিভূত হয়ে যায় । কিন্তু ইতিহাস কোথাও
না কোথাও সত্যকে লিখে রাখে । তাই পরবর্তী গবেষণায় এখন এটা প্রমাণিত সত্য যে, দাদাসাহেব ফালকে নয়
হীরালাল সেনই উপমহাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের জনক । ফালকের নামে সিনেমাশিল্পের
সর্বোচ্চ সম্মাননা দেওয়া হয় কিন্তু হীরালাল সেনের নামে খাস কলকাতায় একটা রাস্তারও
নামকরণ হয়নি । শুনেছি ঢাকাতে তাঁর নামে একটি রাস্তা আছে । সেখানে ‘ফেডারেশন অফ ফিল্ম
সোসাইটিজ অফ বাংলাদেশ’ প্রতি বছর ‘হীরালাল সেন স্মারক বক্তৃতা’র আয়োজন করেন । তারা মনে রেখেছেন উপমহাদেশের
চলচ্চিত্রের জনককে, এদেশে আমরা রাখিনি ।
সত্য বটে,
১৯১৩তে ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’
নামে দাদা সাহেব ফালকে যে কাহিনীচিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন সেটাই দেশের
প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র, কিন্তু প্রথম চলচ্চিত্র নয় । ফালকের ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’ মুক্তি পেয়েছিল
১৯১৩র মে মাসে আর তার অনেক আগে – ষোল বছর আগে অবিভক্ত বাংলার মানিকগঞ্জ জেলার বগজুরি গ্রামের
এক যুবক হীরালাল সেন ইংলন্ড থেকে যন্ত্রপাতি এনে চলমান ছবি বানিয়েছিলেন । বলা যায়
হীরালাল সেন যেখানে শেষ করেছিলেন দাদাসাহেব ফালকে শুরু করেছিলেন সেখান থেকেই ।
ফালকের রাজা হরিশচন্দ্রের আগে ১৮৯৭ থেকে ১৯১৩’র মধ্যে হীরালাল নির্মাণ ও প্রদর্শণ করেছিলেন
চল্লিশটি চলমান ছবি (থিয়েটারের দৃশ্য, বিজ্ঞাপন চিত্র ও দলিল চিত্র বা ডকুমেন্টারি)
। এবং তাঁর চলচ্চিত্র প্রদর্শণের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘রয়াল বায়োস্কোপ
কোম্পানি’ ।
স্থিরচিত্র
থেকে চলমান ছবিতে পৌছানোর
প্রক্রিয়ায়
বহু মানুষের
অনেক আবিস্কার
ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার
পথ পেরিয়ে ফ্রান্সের দুই জমজ ভাই – অগাস্ট ল্যুমিয়ের ও লুই ল্যুমিয়ের ১৮৯৬এর ২৯শে জুন প্যারিসে প্রথম ‘সিনেমাটোগ্রাফ’ যন্ত্রে
চলমান ছবির প্রদর্শন
করেছিলেন
। বায়োস্কোপ
তখন বিশ্বের
এক অত্যাশ্চর্য
বস্তু । আর দু বছরের মধ্যেই
সেই অত্যাশ্চর্য
বস্তুর
নির্মাণ
ও প্রদর্শনের
কৃৎকৌশল
আয়ত্ব করে ফেললেন
ঢাকার মাণিকগঞ্জের
৩১ বছরের বাঙালি
যুবক হীরালাল
সেন ।
হীরালালের জন্ম ১৮৬৬ সালে ঢাকা থেকে
আশি মাইল দূরে মাণিকগঞ্জ জেলার বগজুরি গ্রামে । পিতা –
চন্দ্রমোহন সেন ও মাতা বিধুমুখী দেবী ।
শিক্ষা মাণিকগঞ্জ মাইনর স্কুল ও ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল । সেখান থেকে পিতার সঙ্গে
কলকাতায় গিয়ে ভর্তি হন কলেজে । এই সময় হীরালাল আকৃষ্ট হন ফোটগ্রাফি ও চলচ্চিত্রের
প্রতি । ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি ঘটে । কম বয়স থেকেই ফোটোগ্রাফির প্রতি
দুর্বার আকর্ষণ ছিল হীরালালের । পন্ডিত দীনেশচন্দ্র সেন ছিলেন হীরালালের পিসতুত
ভাই সহপাঠী । কিশোর বয়সে দীনেশচন্দ্র বাগজুরি গ্রামের বাড়িতে কাগজ কেটে লন্ঠনে আলো
ও কাপড়ের সাহায্যে ‘ছায়াবাজি’ খেলা দেখাতেন এই ছায়াবাজির খেলাই হীরালালকে গভীরভাবে
আকৃষ্ট করেছিল, বলা যায় তাকে ফোটোগ্রাফি ও বায়োস্কোপের জগতে টেনে এনেছিল । এ কথা
হীরালাল নিজেও স্বীকার করেছেন । তাঁর নিজের বয়ানে “ এই ঝোঁকের মূলে তুমিই
(দীনেশচন্দ্র), তুমি যে আমাকে লইয়া ছবি আকিতে, সেই সময় ইহার সূত্রপাত । তুমি যেদিন
ছায়াবাজি দেখাইয়াছিলে, সেদিন যে আমার মনে যুগ উল্টাইয়া গিয়াছিল তাহা তোমায় বলি নাই
। কিন্তু সেই ছায়াবাজি দেখার কথা কিশোর জীবনে প্রতিদিনই আমার মনে পড়িয়াছে, ইহাই এই
র্যাল বায়োস্কোপের ভিত্তি” (হাবিবুর রহমান সিরাজ / এইবেলা ওয়েব) । দীনেশচন্দ্র
তাঁর ‘ঘরের কথা ও যুগ সাহিত্য’ গ্রন্থে হীরালালের কথা লিখেছেন । ১৮৯০ নাগাদ নিজ
গ্রাম বাগজুরিতে নিজের ঘরেই একটা স্টুডিও বানিয়ে ফেলেছিলেন । স্টুডিওর নাম
দিয়েছিলেন ‘এইচ এল সেন এন্ড ব্রাদার্স’ । বয়সে তিন বছরের ছোট ভাই মতিলাল
সেনকেও টেনে এনেছিলেন ।
কলকাতা তখন থিয়েটারের শহর । বাঙালির
সেরা বিনোদন তখন থিয়েটার, আর কলকাতার
নাট্যাকাশে রয়েছেন উজ্বলতম জ্যোতিষ্ক অমরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তাঁর ‘ক্লাসিক থিয়েটার’ । অমরেন্দ্রনাথের সহায়তা চাইলেন হীরালাল, এবং পেলেন ।
অমরেন্দ্রনাথের সহায়তায় ক্লাসিক থিয়েটারে বায়োস্কোপ দেখালেন হীরালাল- মতিলাল
১৮৯৮এর ৪ঠা এপ্রিল । এইসব ছিল ছুটন্ত ঘোড়া, উড়ন্ত পাখি, চলন্ত ট্রেন
ইত্যাদির চলন্ত ছবি । তাতে তো কোন গল্প নেই ! এবার হীরালাল ভাবলেন নাট্যকাহিনীর চলমান ছবি
দেখানোর । বিলেত থেকে ক্যামেরা ও চলচ্চিত্র তৈরির যন্ত্রপাতি আনালেন । ক্লাসিক
থিয়েটারে অভিনীত একের পর এক নাটকের দৃশ্যাবলী ধরে রাখলেন সেলুলয়েডে । ‘আলিবাবা’, ‘সীতারাম’, ‘ভ্রমর’, ‘মৃণালিনী’, ‘বুদ্ধদেব’, ‘দোললীলা’ প্রভৃতি মঞ্চসফল
নাটকের চলচ্চিত্র বানালেন । ১৮৯৮তে হীরালাল তাঁর রয়াল বায়োস্কোপ কোম্পানী’র প্রতিষ্ঠা করলেন ।
নাটকের দৃশ্য ছাড়াও হীরালাল তাঁর বায়োস্কোপে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের মিছিলের
দৃশ্যও চলচ্চিত্রায়িত করেছিলেন, তুলেছিলেন বিজ্ঞাপন চিত্র ও চিৎপুর রোড নিয়ে একটি তথ্যচিত্র
। অর্থাৎ
শুধু চলচ্চিত্রই নয়,হীরালাল সেন ভারতের তথ্যচিত্র ও বিজ্ঞাপনচিত্রেরও জনক । ১৯০৩এ
দাদাসাহেব ফালকের মনে যখন বায়োস্কোপ বানানোর কোন ভাবনাই ছিলনা তখন হীরালাল সেদিনের
মঞ্চসফল নাটক ক্লাসিক থিয়েটারের ‘আলিবাবা’ নাটকটিকে সম্পূর্ণ চলচ্চিত্রায়িত
করেছিলেন । আবদাল্লা ও মর্জিনার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন নৃপেন বসূ সেকালের
প্রখ্যাতা অভিনেত্রী কুসুমকুমারী । জানি না এটিকে কেন কাহিনীচিত্রের মর্যাদা
দেওয়া হয় না।
ইতিমধ্যে হীরালালের তৈরি করা পথ ধরে
দেশি-বিদেশী অনেকেই বায়োস্কোপ প্রদর্শনের ব্যবসায়ে নেমে পড়েছেন । ময়দানে তাঁবু
খাঁটিয়ে বায়োস্কোপ দেখানো শুরু করেছেন জামশেদজি ফ্রামজি ম্যাডান আর আর্থিক জোগান
না থাকায় পিছিয়ে পড়লেন হীরালাল । ভাই মতিলালও আলাদা হয়ে গিয়ে দখল নিলেন
হীরালালের ‘রয়াল বায়োস্কোপ কোম্পানী’র । ভাগবে ভোলানাথকে নিজের হাতে গড়ে তাঁর সহযোগী রূপে । সেও
আলাদা হয়ে গিয়ে লন্ডন বায়োস্কোপ কোম্পানী খুলল । সব হারিয়ে হীরালাল একজন সাধারণ
কর্মচারী রূপে ভাগ্নের ‘লন্ডন বায়োস্কোপ কোম্পানী’তে যোগ দিয়েছিলেন । নীঃস্ব
হীরালাল শেষে ছবি বানানো থেকে সরেই গেলেন
। এদিকে শরীরও ভেঙে পড়েছে,দেহে বাসা বেঁধেছে কর্কট রোগ । এমন কি অর্থকষ্টের চাপে
সাধের ক্যামেরা দুটিকেও বন্ধক রেখেছিলেন । টাকা জোগাড় করে সেই ক্যামেরাদুটি আর
ফিরিয়ে নিতে পারেননি ।
১৯১৭’র ২৮শে অক্টোবর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা
গেলেন উপ মহাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জনক হীরালাল সেন মাত্র একান্ন বছর বয়সে ।
হীরালালের মৃত্যুর কয়েকদিন পরে বিধ্বংসী অগিকান্ডে ভষ্মিভুত হয়ে যায় মতিলালের দখলে
থাকা হীরালালের স্মৃতি বিজড়িত রয়াল বায়োস্কোপ কোম্পানির সমস্ত যন্ত্রপাতি,ফিল্ম ও নথিপত্র ।
সেই অগ্নিকান্ডে মৃত্যু হয় ভাই মতিলালের কন্যা অমিয়বালারও ।
আজ চলচ্চিত্র শিল্পের কত রমরমা,আকাশচুম্বী তার
জনপ্রিয়তা । ইতিহাসের নির্মাণ যারা করেন তাদের আর কে কবেই বা মনে রাখে !
হীরালাল সেনের তৈরি করা পথে সিনেমা প্রদর্শনের ব্যবসায়ে নামলেন পার্শি
ব্যবসায়ী ম্যাডান । ময়দানে তাঁবু খাটিয়ে সিনেমা দেখানো শুরু করলেন, নাম দিলেন ‘এলফিনস্টোন
বায়োস্কোপ’ । ম্যাডানের ব্যবসা জমে গেল । ভারতের নানা স্থানে অনেকগুলি চিত্রগৃহের নির্মাণ করলেন তাঁরা । ১৯১৩ নাগাদ
ম্যাডানরা সিনেমা নির্মাণে নামলেন । ইতিমধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে গেল,
বেশি দূর এগোতে পারলেন না ম্যাডানরা । ম্যাডান কোম্পানী ১৯১৯এ একটা পূর্ণ দৈর্ঘের (১০
রিল) সিনেমা বানিয়েছিলেন । বাঙালি – অবাঙালির মিলিত প্রয়াসের সেই ছায়াছবি ‘বিল্বমঙ্গল’ কেই প্রথম বাংলা ছায়াছবি ধরা
হয় । নির্বাক যুগের সিনেমার এই পর্বে
ম্যাডান কোম্পানীর একাধিপত্য । স্ত্রী চরিত্রে অভিনয় করতেন বিদেশিনীরা । অনেক
অভিনেতাও ছিলেন অবাঙালি । যদিও নির্বাক ছবি তাই কোন ভাষায় অভিনয় হচ্ছে তাতে কার কি
! কিন্তু অন্যরকম ভেবেছিলেন একজন, তাঁর নাম ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় – পরবর্তী
কালের বাংলা সিনেমা শিল্পের অভিভাবক, সর্বজন শ্রদ্ধেয় ডিজি ।
ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়
নিজামের হায়দরাবাদ
আর্ট স্কুলের মর্যাদাময় অধ্যক্ষর পদ ছেড়ে ধীরেন্দ্রনাথ চলচ্চিত্রশিল্পে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন
কেন সে এক বিস্ময় ।
ধীরেন্দ্রনাথ ছিলেন অভিজাত বংশের সন্তান ।
রবীন্দ্রনাথের কন্যা মীরা ছিলেন তাঁর বৌদি অর্থাৎ দাদার স্ত্রী । নির্বাক যুগ থেকে
নভেম্বর ১৯৭৮এ মৃত্যু পর্যন্ত ডিজি ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের সর্বজন শ্রদ্ধেয়
মানুষ । নিজামের হায়দরাবাদ আর্ট স্কুলের মর্যাদাময় অধ্যক্ষের পদ ছেড়ে দিয়ে ঝাঁপিয়ে
পড়েন চলচ্চিত্র শিল্পে,গড়ে তোলেন ‘দি ইন্দো বৃটিশ ফিল্ম কোম্পানী’ ১৯১৮তে । ধীরেন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন চলচ্চিত্রকে শিল্পের
পর্যায়ে নিয়ে যেতে,গিয়েও ছিলেন ।
ধীরেন্দ্রনাথের মানস গড়ে উঠেছিল শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে । ওখান
থেকেই এন্ট্রান্স পাশ করেছিলেন । রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অভিনয়ও করেছিলেন । লন্ডন আর্ট স্কুলের
পাঠ শেষ করে নিজামের হায়দরাবাদ আর্ট স্কুলে অধ্যক্ষর পদে যোগ দিয়েছিলেন । তারপর সব
ছেড়ে চলচ্চিত্রের মায়াবী ডাকে চলে এলেন কলকাতায়, গড়ে তুললেন ‘ইন্দো-ব্রিটিশ ফিল্ম
কোম্পানী’। ধীরেন্দ্রনাথ
অনুভব করেছিলে সম্পূর্ণভাবে বাঙালিদের অংশগ্রহণ ভিন্ন বাংলা সিনেমার বিকাশ সম্ভব
নয় । ধীরেন্দ্রনাথের বিরাট অবদান চলচ্চিত্রে বাঙালির
প্রভাব বিস্তার । বস্তুত তার সংস্থা বাংলা সিনেমার নির্মাণে উদ্যোগ নেওয়ার ফলেই
বাংলা চলচ্চিত্রে ম্যাডানদের একাধিপত্য স্তিমিত হতে শুরু করে এবং চলচ্চিত্রের
সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বাঙালি আধিপত্য বিস্তারের সূচনা হয় । ধীরেন্দ্রনাথই ছিলেন
প্রথম বাঙালি প্রযোজক এবং সম্পূর্ণ বাঙালি শিল্পী ও কলাকুশলীদের নিয়ে নির্মিত
পূর্ণাঙ্গ বাংলা সিনেমার জনক ।
জন্ম
১৮৯৩এর ২৬শে মার্চ কলকাতায় । হীরালাল সেন যখন বায়োস্কোপের কৃতকৌশল আয়ত্ব করে চলমান
ছবি বানাচ্ছেন ধীরেন্দ্রনাথ তখন তিন বছরের শিশু । সেই ধীরেন্দ্রনাথই হয়ে উঠেছিলেন
বাংলা সিনেমাশিল্পের আধুনিক হয়ে ওঠার কর্মকান্ডের প্রথম পুরোহিত ।
আধুনিক
মননের মানুষ ধীরেন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন চলচ্চিত্রের অভিনয়ে মেয়েরা আসুক,বুঝেছিলেন বিদেশিনী মেয়েদের দিয়ে অভিনয় করিয়ে বাংলা সিনেমা
শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারবে না । তখন ম্যাডানদের বাংলা সিনেমায় স্ত্রী চরিত্রে
অভিনয় করতেন এংলো ইন্ডিয়ান অভিনেত্রী পেসেন্স কুপার, আলবার্টিনা, সিলভিয়া বেল
প্রমুখ । বাঙালি অভিনেত্রী সংগ্রহের জন্য ধীরেন্দ্রনাথ সোনাগাছির নিষিদ্ধ পল্লীতে
ঘুরেছেন, নিজের বন্ধুদের কাছে আবেদন করেছেন । সেকালে এটা খুব সহজ ছিল না সামাজিক নিষেধকে অগ্রাহ্য করা,যার জন্য অপবাদও কম সইতে হয়নি তাঁকে । এটা তাঁর কথার কথা
ছিল না । নিজের স্ত্রী প্রেমলতিকা দেবী ও কন্যা মনিকাকে সিনেমায় নামিয়েছিলেন
সামাজিক নিষেধের বেড়া অগ্রাহ্য করে । প্রথম ছবি ‘বিলা্ত ফেরত’এ প্রখ্যাত এডভোকেট
বিধুভূষণ মুখার্জীর মেয়েকে নায়িকার ভুমিকায় নামিয়ে অসাধ্য সাধন করেন্গালি
‘বিলেত
ফেরত’ ছবির সাফল্যের পর নিজামের আমন্ত্রণে হায়রাবাদে গেলেন, খুললেন নতুন সংস্থা ‘লোটাস
ফিল্ম কোম্পানী’ । নিজামের
আশীর্বাদও পেয়েছিলেন এমনকি নিজের প্রাসাদেও সুটিং করার অনুমতি দিয়েছিলেন
ধীরেন্দ্রনাথকে । আবার সেই নিজামেরই পাইক-বরকন্দাজরা ধীরেন্দ্রনাথকে চব্বিশ ঘন্টার
মধ্যে দায়দরাবাদ ছাড়ার নোটিশ ধরিয়ে দিছিল যখন তিনিঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে শাহজাদী রাজিয়া
বেগম ও হিন্দু রাজার প্রেমকাহিনী নিয়ে ছবি করতে চাইলেন । এরপর ধীরেন্দ্রনাথ আর
ফিল্ম কোম্পানী খোলেননি । শুধু পরিচালনা ও অভিনয় করেছেন । ৫৩টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন
ধীরেন্দ্রনাথ ।
বাংলা
চলচ্চিত্র শিল্পের বেড়ে ওঠায় অসামান্য অবদান ছিল ধীরেন্দ্রনাথের । দুই
প্রবাদপ্রতীম চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব প্রমথেশ বড়ুয়া ও দেবকী কুমার বসু তাঁর হাত ধরেই
সিনেমায় এসেছিলেন । তাঁর সময় থেকে বিত্তবান বাঙালি ব্যবসায়ীয়াও চলচ্চিত্রশিল্প
সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন । এই সময়ে নির্মিত হয় বাঙালি ব্যসায়ীয় উদ্যোগে ভবাণীপুরে রসা
থিয়েটার এখন যার নাম ‘পূর্ণ’ চিত্রগৃহ । এখানেই ধীরেন্দ্রনাথের প্রথম সিনমা ‘বিলেত ফেরত’
মুক্তি পায় ১৯২১এর
২৬শে ফেব্রুয়ারি । বড় মাপের অভিনেতা ছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ । শান্তিনিকেতনে
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাল্মিকী প্রতিভায় অভিনয় করেছিলেন । ৮৩ বছর বয়সে বৃদ্ধাবস্থায়
অলীকবাবু নাটকে যুবকের ভূমিকায় অবিনয় করে অবাক করে দিয়েছিলেন । ধীরেন্দ্রনাথের
নিজের কথায় “একদা আমি ঠাকুরবাড়ি থেকে শুরু করে বহু মঞ্চে অলীকবাবু নাটকে অভিনয়
করেছিলুম । জীবনে একশো রজনীরও বেশি খ্যাতির সঙ্গে এই নাটকের নায়ক অলীকপ্রকাশের
চরিত্রে অভিনয় করেছি । শেষ অভিনয় করলাম ১৯৭৩ সালের ২৪শে জুলাই স্টার থিয়েটারে” । ( গৌরাঙ্গ প্রসাদ ঘোষের সঙ্গে
সাক্ষাৎকার / ‘সোনার দাগ’ গ্রন্থ থেকে ) ।
১৯৭৪এ
পদ্মভূষণ ও ১৯৭৬এ দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে সম্মানিত হন ভারতীয় চচ্চিত্রের একদা
অভিভাবক ডিজি । ১৯৭৮এর ১৮ই নভেম্বর কলকাতায় প্রয়াত হন বাংলা সিনেমাশিল্পের পথিকৃত
ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ।
বীরেন্দ্রনাথ সরকার
বাংলা সিনেমাশিল্প অনেকটা পথ পেরিয়ে সাবালক হওয়ার পথে
এগিয়েছে । এই সময় সিনেমাশিল্পের বিপুল ব্যবসায়িক সম্ভাবনার কথা অনুধাবন করে বাংলা
চলচ্চিত্রশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হলেন এক ব্যক্তিত্বপূর্ণ কর্মপুরুষ, যিনি বাংলা
সিনেমার চলচ্চিত্রায়ন, প্রদর্শন ও বিপণনের ক্ষেত্রে প্রবল ভূমিকা নিলেন । তিনি
বীরেন্দ্রনাথ সরকার ।
চলচ্চিত্রশিল্পের প্রতি বাঙালির আগ্রহ বেড়েছিল, চলচ্চিত্র
নির্মাণের সংখ্যাও বাড়ছিল কিন্তু ছবির প্রদর্শনের জন্য প্রেক্ষাগৃহ সবই ম্যাডানদের
দখলে, একমাত্র পূর্ণ থিয়েটার ছাড়া । আধুনিক স্টুডির
গড়ে ওঠেনি । সিনেমার সুটিং হত থিয়েটার
হল’এ । এই সময় লন্ডন থেকে সিভিল
ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে সে যুগের প্রখ্যাত ব্যারিষ্টার স্যার নৃপেন্দ্রনাথ সরকারের
পুত্র বীরেন্দ্রনাথ সরকার কলকাতায় ফিরে চলচ্চিত্র সম্পর্কে আগ্রহী হলেন । বীরেন্দ্রনাথ তাঁর দুই বন্ধুর সঙ্গে মিলে
বানালেন ‘ইন্টারন্যাশানাল ফিল্ম ক্রাফট’ সংস্থা । তাঁরা প্রথমেই
নির্মাণ করলেন ‘চিত্রা’নামে একটি চিত্রগৃহ, যার দ্বারোদ্ঘাটন করেছিলেন সুভাষচন্দ্র
বসু ১৯৩০এর ২৯শে ডিসেম্বর । চলচ্চিত্রশিল্পে বিরাট কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বীরেন্দ্রনাথ । কলকাতা, বর্ধমান ও হাওড়ায় মোট ৬টি
প্রেক্ষাগৃহের নির্মাণ করেন । বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে বীরেন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ অবদান ‘নিউ থিয়েটার্স’
স্টুডিওর নির্মাণ ও পরিচালনা । ১৯৩০এর ১৯শে সেপ্টেম্বর
পথ চলা শুরু করে নিউ থিয়েটার্স, সেই থেকে আজও প্রায় শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে
বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের প্রাণকেন্দ্র হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ।
আর শুধু বাংলা ছবিই বা কেন এক সময়ে হিন্দি ছবির নির্মাণও এখান থেকেই হত ।
প্রাথমিক যুগের বিশৃঙ্খলার অবসান
ঘটিয়ে চলচ্চিত্রায়ন, ছবির প্রদর্শন ও বিপণনে সিনেমাকে একটা শৃঙ্খলায় বাঁধতে
চেয়েছিলেন বীরেন্দ্রনাথ, এবং পেরেওছিলেন । বস্তুত বাংলা সিনেমা নির্মাণে
সাবালকত্বের ছোঁয়া লাগলো নিউ থিয়েটার্সের আধুনিক ও উন্নততর ব্যবস্থাপনায় । বাংলা
সিনেমা মানেই তখন নিউ থিয়েটার্স আর তার নেপথ্যের প্রাণপুরুষ বীরেন্দ্রনাথ। সেকালের
প্রথিতযশা অভিনেত্রী কানন দেবী বীরেন্দ্রনাথের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন “... এই
নীরব মানুষটি যে শিল্প ও শিল্পীর অকৃত্রিম পূজারী এবং ভারতে চলচ্চিত্রশিল্পের
অফ্রগতিকে ইনি একাই একশ বছর এগিয়ে দিয়েছেন সে যুগের শ্রেষ্ঠ শিল্পী, সুরকা্র
গীতিকার,পরিচালকদের তাঁর পতাকাতলে একত্র করে এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই । এ
অবদানের ক্ষেত্রে বাঙালি মাত্রেই ঋণী । জগতের রসিক দরবারে আজ ভারতীয় চলচ্চিত্রের
এই সম্মান ও স্বীকৃতি হয়তো স্বপ্নই থেকে যেত যদি না বি এন সরকারের মত মানুষ এই
কাজে এগিয়ে এসে আনুকুল্যের হাল ধরতেন” । (‘সবারে আমি নমি’ / কানন দেবী ) । দেবকী
বসু, প্রমথেশ বড়ুয়া, কানন দেবী, সায়গল, পঙ্কজ মল্লিক, রাইচাদ বড়াল, কৃষ্ণচন্দ্র দে,
পৃথ্বিরাজ কাপুর, দুর্গা খোটে, ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ী সান্যাল, তুলসী চক্রবর্তী
প্রমুখ কত স্মরণীয় শিল্পীর উত্থ্বান হয়েছে নিউ থিয়েটার্স থেকে তার ইয়ত্তা নেই ।
বাংলা চলচ্চিত্রের নির্মাণ ও বিকাশে ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলীর সঙ্গে একই মর্যাদায়
উচ্চারিত হয় বীরেন্দ্রনাথ সরকারের নাম ।
বীরেন্দ্রনাথ ১৯৭০সালে দাদাসাহেব
ফালকে পুরস্কারে সম্মানিত হন । ১৯৮০র ২৮শে নভেম্বর প্রয়াত হন বাংলা চলচ্চিত্রের
প্রথম যুগের কর্মপুরুষ বীরেন্দ্রনাথ সরকার ।
নিঃশব্দে সিনেমায় কথা ফোটানোর
কৃৎকৌশল চলে এসেছে । ১৯২৮এ মুক্তি পেয়েছে আমেরিকায়
প্রথম পূর্নাঙ্গ সবাক চিত্র ওয়ার্নার ব্রাদার্সের ‘লাইটস অফ নিউইয়র্ক’ । ভারতে
প্রথম পূর্ণাঙ্গ সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেন আরদেশির ইরাণী - ‘আলম-আরা’ । ১৯৩১এর
১৪ই মে মুক্তি পেল ছবিটি । আর ঐ একই বছরে জুন মাসে প্রথম কথা বলা বাংলা সিনেমা ‘জোর
বরাত’ মুক্তি পেল । ‘কথা না বলা যুগের সিনেমা কথা’ অতয়েব
শেষ হল । এরপর বাংলা সিনেমা নিয়ে থেকে যায় অনেক কথা । প্রমথেশ বড়ুয়া, দেবকী বসু
থেকে সত্যজিৎ রায় । সত্যজিৎ রায়, ঋতুপর্ণ সেনগুপ্ত থেকে রাজ চক্রবর্তী, সৃজিত
মুখার্জীরা । সে সব অন্যকথা বলা যাবে বারান্তরে কিংবা বলবেন অন্য কেউ । আমি শুধু
ভারতীয় চলচ্চিত্রশিল্পের উদ্ভব ও সাবালকত্বে পৌছানোর কয়েকটি বিন্দু ছুঁয়ে গেলাম ।
(তথ্যসূত্র – (১) ভারতকোষ
৩য় খন্ড / বঙ্গীয় সাহিত্য পরিসৎ সংস্করণ (২) ‘সোনার দাগ’ / গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষ, (৩)
‘বাংলা সিনেমার কথকতাঃপ্রথম পর্ব’ / পার্থ রাহা, (৪) ‘সবারে আমি নমি’/ কানন দেবী, (৫)‘নিজেরে
হারায়ে খুজি’/অহীন্দ্র চৌধুরী ) ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন