একটা তেরো টাকা দামের রেক্সিনের স্যুটকেশ, পকেটে তিরিশটা টাকা আর একটা সতরঞ্চি সঙ্গি করে হাওড়া স্টেশন থেকে রওনা দিয়েছিলাম । রেল একটা পাশ পাঠিয়ে দিয়েছিল এপয়েন্টমেন্ট লেটারের সঙ্গে । দুজন খুব কাছের বন্ধু হাওড়া স্টেশনে এসেছিল তুলে দিতে । তাদের একজনের বাবার ট্যাক্সি ভাড়া খাটতো । সেদিন রাস্তায় বেরোয় নি, আমাকে নিয়ে এলো তাদের গাড়ি করে । আর একজন দুপ্যাকেট পানামা সিগারেট কিনে দিল । রাত্রি আড়াইটা নাগাদ বোম্বাই এক্সপ্রেস বিলাসপুর পৌছালো । প্ল্যাটফর্মে সতরঞ্চিটা বিছানোর একটা যায়গা পেয়ে গেলাম। দেখলাম আরো দুএকটা সতরঞ্চি বিছানো হচ্ছে । ব্যস ওখান থেকেই নতুন মানুষের সঙ্গে আলাপ শুরু হ’ল । একই পথের পথিক তো । আর একা থাকলাম না। তিনজনে মিলে ‘আমরা’ হয়ে গেলাম ।
রেলের বাজারে একটা বাঙালি হোটেলে
৬০ পয়সায় মাছভাত খেয়ে অফিসে রিপোর্ট করলাম । পুরানো লোকেরা অনেক ভালোবাসা দিলেন ।
বড় ডিভিসনাল অফিস, অনেক লোক কাজ করেন সত্তর ভাগ বাঙালি আর তিরিশ ভাগ দক্ষিণ
ভারতীয়, সবাই কলকাতা বা খড়গপুর থেকে বদলি হয়ে গেছেন ওখানে । বাঙ্গালিদের দল ভারি
হল – আদরতো পাবোই । মেডিক্যাল হতে দিন তিনেক লাগলো । প্রথমে সপ্তাখানেক শোয়ার ব্যবস্থা হ’ল যাযাবরের মতো – মানে কেউ ছুটিতে গেছেন
তার কোয়ার্টারে শুয়ে ঘর পাহারা দেওয়া । পরে একটা মেসে ঢুকে গেলাম । একটা রেল
কোয়ার্টারে আরো ৪/৫ জনের সঙ্গে ভাগ করে থাকা, দশটাকাকা দিয়ে কেনা একটা দিড়ির চারপাইএ শোয়া, আর অন্য একটা মেস’এ খাওয়া কুড়ি
জনের মত একসঙ্গে । ২৩ বছর বয়স – ছাড়া গরুর মতো । তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কথা বলার মত কেউ নেই, ওটা কোরনা বলার মত কেঊ নেই, শুধু
নিজের জন্য কিছু ভাবার মত মনটাও তৈরী হয় নি ।
নাটকের দল করা, রেলকলোনির
রিক্রিয়েশন ক্লাব লাইব্রেরী, সাংস্কৃতিক সামাজিক কাজকর্ম, মৃতদেহ সৎকার, হাসপাতালে
রাত জাগা , কাজের বাড়িতে পরিবেশন করা এইসব কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তাম আর এইসব করার সুবাদে প্রচুর মানুষের ভালোবাসা পেয়েছিলাম । মায়ের মত, নিজের বড়
দাদার মত ভালোবাসা । মানুষের ওষ্ঠ থেকে তার বিষদ-বিন্দু শুষে নিতে চাওয়ার মধ্যে, আর একজনের চকচকে
চোখ দেখতে পাওয়ার মধ্যে যে কি আনন্দ, কি সুখ তার তো কোন লিখিত শব্দ হয় না ! মা ভাই
বোন ছেড়ে দূরে থাকার কোন কষ্টই সেইসব মানুষেরা আমাকে পেতে দেননি । থিয়েটার আর
কবিতার আবৃত্তি খুব করতাম । সামান্য যা লেখালেখির চর্চা করতাম তা গদ্য । কবিতা লেখার চেষ্টা করিনি কোন
দিন, ইচ্ছেও হতো না । হাংরি জেনারেশন না কিসব বলতো নিজেদের, ওদের কবিতা কয়েকটা পড়ে আধুনিক কবিতার
ওপরই একটা বিতৃষ্ণা এসেছিল, ওগুলোকে ‘অন্ধকারের জীবন বেদ’ মনে হতো ।
১৯৬৭ তে সারা ভারতে প্রবল
প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া । জাতীয় কংগ্রেসের সারা ভারতে একচ্ছত্র শাসনের টালমাটাল অবস্থা, পশ্চিম বাংলাতেও
প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার করলো অজয় মুখার্জীর মুখ্যমন্ত্রীত্বে, বছর না পেরোতেই
রাষ্ট্রপতি শাসন । জাতীয় কংগ্রেসের একচ্ছত্র শাসন অবসানের সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল ১৯৬৭ থেকেই ।
সেই উত্তাপে শরীর সেঁকেছিলাম আমরা অনেকেই, দূরে থেকেও ।
১৯৬৮র ১৯শে সেপ্টেম্বর রেল সহ
কেন্দ্রীয় সরকারী কর্মচারিদের সংগঠনগুলি একদিনের টোকেন স্ট্রাইক ডাকলো । স্ট্রাইক
বে-আইনী ঘোষণা করলো সরকার । তো কর্মচারীদের স্ট্রাইক আবার কবে আইনী হয় ! আমার
চাকরির বয়স তখন সবেমাত্র তিন বছর সাত মাস । দাবি ছিল প্রয়োজন ভিত্তিক ন্যুনতম বেতন । ‘চল পানসি বেলঘরিয়া’, ‘যো হোগা দেখা
যায়গা’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম ধর্মঘটে । ‘ব্রেক ইন সার্ভিস’ হ’ল , মানে আমার চাকরি
জীবনের একটা দিন মাইনে সহ বাদ হয়ে গেলো । সেই একটা দিন এবং একদিনের বেতন আর ফিরে
পেলাম না । বার্ষিক মাইনে বাড়ার বা ইনক্রিমেন্ট’এর দিনটাও পিছিয়ে গেলো একদিন ।
সার্ভিস বুকে প্রথম লালকালির দাগ পড়লো , তা পড়ুক । চাকরির তিন বছরের মাথায় এই
শাস্তি যে আমাকে দমিয়ে দিয়েছিল তা নয় বরং আরো কঠিন করেছিল মানসিক ভাবে ।
খবরের কাগজে আজ দেখলাম । ১৯৭৪এর
পর ভারতীয় রেলের ১৩লক্ষ কর্মচারী লাগাতার ধর্মঘটের নামতে চলেছেন । নব্বইভাগ
রেলকর্মচারীই ধর্মঘটের পক্ষে মতপ্রকাশ করেছেন । ১৯৭৪এর সেই সময় এবং ঠিক একবছর পরে
সেই কৃষ্ণপ্রহর ১৯৭৫এর জরুরী অবস্থাকে ছুঁয়ে যাবো পরের পর্বে ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন