একটি নাটকের খোঁজে
কাহিনির সবটাই ডাক্তার নন্দীর কাছ
থেকে শোনা । ডাক্তার ভোলানাথ নন্দী- বছর পাঁচেক হবে বোধহয়, এপাড়ায় ফ্ল্যাট
নিয়েছেন । মফঃস্বলের এই আধা গ্রাম –আধা শহরের আটপৌরে লোকজনের মাঝে ডাক্তার নন্দী
বেশ বড় মাপের লোকই বলতে হবে । আধা গ্রাম হলে কি হবে,
বহুতল ফ্ল্যাটবাড়ি গজাতে তো বাধা নেই, গজিয়ে উঠছেও অনেক ।
শুনেছি মনরোগের চিকিৎসক, তবে এপাড়ায় তাঁর কোন চেম্বার নেই,
থাকার কোন কারনও নেই । বেশ রাশভারি মানুষ, শুনেছি আগে দক্ষিণ
কলকাতার যাদবপুর না কোথায় থাকতেন ।
গম্ভীর
প্রকৃতির মানুষ ডাক্তার নন্দী, পাড়ায় বেশি মেলামেশা ক’রতেন না, মানে পাড়ায় দুর্গা পুজো বা কোন অনুষ্ঠানে তাকে খুব বেশি
দেখা যেত না, তবে আমার সঙ্গে বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল । কেন জানিনা আমাকে খুব ভালোবাসতেন ।
মাঝে মধ্যেই আমার সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলতেন,
গল্প করতেন ,
আমাকে ডেকে পাঠাতেন । কিন্তু কোনদিন তাঁর
পারিবারিক ব্যাপারে কোন কথা বলতেন না , শুধু জেনেছিলাম তাঁর একমাত্র ছেলে, আমার বয়সী বাইরে
ডাক্তারী পড়ছে । আমি একটু আধটু নাটক-থিয়েটার করি আর সেই সূত্রেই ডাক্তার নন্দীর সঙ্গে আলাপ
হয়ে গিয়েছিল ।
ডাক্তার
নন্দী তখন এ পাড়ায় নতুন এসেছেন । আগের দিন পাড়ার রবীন্দ্র ভবনে আমার লেখা একটা
নাটক অভনীত হয়েছিল, আমি সকালে রাস্তার মোড়ের দোকানে চা খাচ্ছিলাম, ডাক্তার বাবু রিকশতে
আসছিলেন – বোধয় বাজার করে ফিরছিলেন । রিকশ থামিয়ে কাছে এলেন,
বললেন কাল তোমার নাটকটা দেখলাম, একদিন এসো আলাপ করবো
। আমি অবাক হলাম, আজকাল বাড়িতে কমপ্লিমেন্টারি কার্ড দিয়ে এলেও টেলি
সিরিয়াল ছড়ে লোকে নাটক দেখতে আসে না , আর ডাক্তার বাবুর মত ব্যস্ত লোক নিজে থেকে
আমার নাটকটা দেখতে এসেছিলেন ! ডাক্তার বাবু বলেছিলেন ‘এমনিতে নাটক-টাটক
দেখার সময় পাই না কিন্তু তোমার নাটকের – কি যেন নাম – ‘এখন অসুখ’ তাইতো’ ? আমি ঘাড় নাড়লাম ,
ডাক্তার বাবু বলেছিলেন ‘হ্যা, ওই নামটাই আমাকে
আকর্ষণ করলো, আসলে আমি তো ডাক্তার, তাই ভাবলাম দেখি নাট্যকার কোন অসুখের কি ডায়াগনোসিস করেছে’ ।
অবাক
হলাম আবার ভালোও লাগলো । নাটকটা ছিল এক প্রবীণ দম্পতির আত্মযন্ত্রণার ছবি । তাদের
একমাত্র সন্তান বিদেশে চাকরী করতে গিয়ে সেখানেই থেকে গেছে । বিয়ে করার পর গত
পনেরো বছরে একদিনের জন্যও বাবা মাকে দেখতে আসেনি । টাকা পাপাঠায়, ফোন করে, খবর নেয় কিন্তু
একদিনের জন্যেও সার সময় কিংবা ইচ্ছা হয়না । এদিকে মা’র মৃত্যু হয়,
খবর যায় । ছেলে আসবে বলে বৃদ্ধ বাবা একদিন
মৃতদেহ রেখে দেন,ছেলে তার গর্ভধারিনীকে দেখতে আসবে। কোন ফ্লাইটে আসবে ছেলে
তাও জানিয়েছে । বাবা পথ চেয়ে থাকেন, কিন্তু শেষ মুহুর্তে ছেলের বদলে আসে একটা ফোন
– ‘বাবা, কাজের চাপে যেতে
পারছি না , টিকিট ক্যান্সেল করেছি’ ।
তবে কি ডাক্তার বাবু আমার নাটকে
নিজেকে খুঁজতে চেয়েছিলেন ? ভাবলাম, কিন্তু ডাক্তার বাবুর ছেলে তো বিদেশে পড়ে না ! সেদিন ডাক্তার বাবুর বাড়ি গিয়েছিলাম, পরে আরো অনেকবার । ডাক্তার বাবুও আমাকে খুব
ভালোবেসে ফেলেছিলেন ।একদিন ডাক্তার বাবুকে বললাম ‘
ডাক্তার বাবু,
আপনি তো মনের নানান জটিল রোগের চিকিৎসা করেন, আপনার কেস স্টাডি
থাকে একটা গল্প বলুন না, যা থেকে একটা নতুন নাটক লিখতে পারি’
। ডাক্তার বাবু মিনিট খানেক আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন,
তারপর উঠে গিয়ে আলমারি থেকে একটা পুরোনো
খবরের কাগজ আমাকে দিয়ে বললেন পড়ো । দেখলাম কাগজের তারিখটা ১৬ই এপ্রিল ২০০২। একটা সংবাদে দাগ দেওয়া রয়েছে, পড়লাম । ক্লাস সেভেনের একটা ছেলে তার সহপাঠীকে
চেয়ারে বেঁধে গলা টিপে খুন করেছে । যকে মেরেছে সে ওর স্কুলেরই ফার্স্ট বয় ছিল , খুনি ছেলেটিও খুব
মেধাবি ছাত্র ছিল, তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ । এইটুকুই মাত্র ছিল খবরটা ।
ঘটনাটা আমি জানতাম, কাগজে দেখেছিলাম, তখন সবেমাত্র মাধ্যমিক পাশ করেছি, তারপর ভুলেও গেছি ।
এমন ঘটনা এতো ঘটছে যে তা জেনে কেউই আর তেমন বিচলিত হয়না,
আমিও হইনি ।
আমি
বললাম ‘কিন্তু ডাক্তার বাবু, এইটুকু মাত্র কাহিনি নিয়ে নাটক হবে কি করে ? নাটকীয়তা কোথায়’ ? ডাক্তার নন্দী
মনে হলো সামান্য উত্তেজিত হলেন ‘কি বলছো তুমি নাট্যকার ,
নাটকীয়তা নেই ?
একটা এগারো বছরের নিষ্পাপ শিশু তার সহপাঠীকে
খুন করলো, নাটকীয়তা নেই ? সমাজের কোন গভীর অসুখ তাকে দিয়ে একাজ করালো, নাটকীয়তা নেই বলছ’ ? আমি বললাম না, মানে পরের ঘটনা গুলো
না জানলে...’ , কথাটা শেষ হল’না, ডাক্তার বাবু বললেন ‘বলবো,
সব বলবো ,
তবে আজ নয়’,
এই একটিমাত্র কেসই আমি স্টাডি করছি বারো বছর
ধরে’ ।
সেদিন
চলে এলাম, অনেকগুলো ছবি মনে ভীড় করলো । কি হ’ল ছেলেটির,
সে কি পেশাদার অপরাধী হ’য়ে গেলো ? তার মা, তাঁরই বা কি পরিনতি
হলো ? আবার নিজেকে তিরস্কারও করলাম , দূর! আমি
কি জম্পেশ টেলি সিরিয়াল লিখছি নাকি ! আমার মস্তিস্ক জুড়ে ঐ কথাটা ঘুরপাক খচ্ছে, সমাজের এ কোন গভীর অসুখ ! কার পাপে একটা নিষ্পাপ শিশু খুনি হয়ে যায় !ক’দিন পরে ডাক্তার বাবুর ডাক পেয়ে গেলাম । ‘তোমাকে খুব দরকার, আমার একটা উপকার
করতে হবে , আমার কাজে লাগবে তোমার সাহায্য’ । আমি বুঝতে পারলাম
না আমার মত একটা থিয়েটার করা তরুণ অত বড় মাপের চিকিৎসকের কি কাজে লাগবো । বললেন ‘তোমাকে একটু অভিনয়
করতে হবে, দশ পনেরো মিনিট । আমার চিকিৎসার কাজে তোমার এই দশ পনেরো মিনিটের অভিনয়টা খুব
কাজে লাগবে । বিশেষ একজনের চিকিৎসার এটাই শেষ ধাপ হতে পারে , আমি নিশ্চিত এই শেষ
ধাপটা পেরোলে রোগী হয়তো সুস্থ হয়ে উঠবে,
ধীরে ধীরে নিজেকে ফিরে পাবে’ । আমি বললাম ‘কিন্তু ডাক্তার বাবু,
আমার নাটকের কাহিনিটার কি হবে, আজকে বলবেন নয়া’ ? বললেন ‘হ্যা হ্যা আজই বলব, মাত্র আট-দশ মিনিট, আমাকে আমার চিকিৎসার শেষ ধাপটা পেরোতে দাও ।
আমি
সম্মোহিতের মত শুনে যাচ্ছিলাম, ডাক্তার বাবু আমাকে দিয়ে কি করতে চাইছেন ? ডক্তার বাবুর কথায়
হুঁশ ফিরল, ব’ললেন, শোন,’আমি একজনকে নিয়ে আসছি, তোমার কাকিমার যা বয়স হওয়া উচিত সেই বয়সী, তুমি তার ছেলের
বন্ধু আজই দেরাদুন থেকে এসেছ’ । একটা সাদা খাম
আমার পকেটে দিয়ে বললেন ‘চিঠিটা ওর হাতে দেবে,
কোন প্রশ্ন করলে ইতিবাচক উত্তর দেবে , হ্যা, বলা হয়নি ও কিন্তু
চোখে দেখতে পায় না , ঠিক আছে ? আমি আসছি’ । এক সুদর্শনা
মহিলাকে নিয়ে ভেতরে এলেন , সত্যিই কাকিমা বলে ডাকতে ইচ্ছা হ’চ্ছিল –
অসাধারণ ব্যক্তিত্বময়ী চেহারা । ডাক্তার বাবু
বলতে বলতে ঘরে ঢুকলেন ‘দেখ সুপর্ণা, শুভর বন্ধু এসেছে, শুভ পাঠিয়েছে তোমার সঙ্গে দেখা করতে’ । আমি নিপুন অভিনেতার মত প্রণাম করলাম, উনি বললেন ‘তুমি শুভর বন্ধু ? শুভ কেমন আছে ? পরীক্ষাতে ফার্স্ট
হয়েছে তো ?’ আমি বললাম হ্যা কাকিমা প্রত্যেক বছর ওই তো ফার্স্ট হয়, এবারও হয়েছে , ও ছাড়া আর কে
ফার্স্ট হবে ?’ উনি বললেন ‘ঠিক বলেছ, জান কত বকতাম – বলতাম তোমাকে সমস্ত পরীক্ষায় ফার্স্ট হ’তে হবে, ও কথা রেখেছে ।
কিন্তূ কবে আসবে শুভ কিছু বলেনি’ ? স্টেজে মেকাপ করার মত আমি বললাম ‘ এই তো সামনের পূজোর
ছুটিতেই আসবে বলছিল , আপনাকে একটা চিঠিও দিয়েছে ‘
বলে পকেট থেকে সাদা খামটা ওনার হাতে দিলাম ।
বললেন ‘শুভ চিঠি দিয়েছে ? ওতে লেখা আছে পূজোর ছুটিতে আসবে ?’
বললাম ‘হ্যা সে রকমই তো বললো’ । উনি চিঠিটা বুকে চেপে ধরলেন । আমি মঞ্চে
অভিনয় করি , কিন্তু ছেলের জন্য দৃষ্টিহীন মাএর এমন দুর্বল করে দিল বইকি ! আমাকে আর বেশিক্ষণ অভিনয় করতে হ’লনা ,
‘এবার তুমি ভেতরে যাও সুপর্ণা ।
শুভর বন্ধু এখনো নিজের বাড়িতেই যায়নি , অনেক দূর যেতে হবে’
। উনি বললেন ‘যাও বাবা, শোন, তুমি ফিরে
যাবার আগে, একবার দেখা করে যেও, শুভর জন্য আলুর চিপস কিনে রাখবো নিয়ে যেও, ও আলুর চিপস খেতে
খুব ভালোবাসে’ । ডাক্তার বাবু
ওনাকে ভেতরে রেখে এলেন ।
আমি বুঝলাম আজকে আর গল্পের শেষ টুকু শোনা হবে
না । বললাম, ডাক্তার বাবু আজ তবে
আমি যাই । উনি বললেন, আরে বোস বোস গল্পের বাকিটা শুনবে না ? আমি ব’সলাম, ডাক্তার বাবু ব’লে চললেন । ‘ছেলেটা পড়াশোনায়
খুব ভালো ছিল, কিন্তু শুধু ভালো হ’লেইতো হবে না, ওর মা চাইতো ওকে ফার্ষ্ট হ’তে হবে প্রতিটি
পরীক্ষায়, সব কিছুতেই । খেলা ধুলো ছবি আঁকা সব বন্ধ –
শুধু দৌড় ফার্ষ্ট হওয়ার জন্য । সেবার ক্লাস
সেভেনের বার্ষিক পরীক্ষায় ছেলেটি সে্কেন্ড হয়েছিল । ওর মা খুব বকাবকি করেছিল , গল্পের বই, ছবি আঁকার সরঞ্জাম – সব ফেলে দিল , শুধু স্কুলের বই
পড়তে হবে আর ফার্ষ্ট হ’তে হবে । ছেলেটির মা’র এই বিকৃত মানসিকতার দাবি মেটানোর চাপ
ওইটুকু ছেলে সামলাবে কিকরে ? তাই তার সহপাঠী যে বরাবর ফার্ষ্ট হ’ত তাকেই সরিয়ে দিল গলা টিপে খুন করে’ । আমি শুধু বললাম ‘তারপর’
? ডাক্তার নন্দি ব’লে চললেন ‘জুভেনাইল কোর্টের
বিচারে সাজা হ’য়েছিল মাত্র পাঁচ বছর –সব কথা অকপটে স্বীকার করেছিল বলে । খুব মেধাবী ছিল, সংশোধনাগারে
পড়াশোনা ক’রে সাফল্যের সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে,
তারপর জয়েন্ট এনট্রান্সে সফল হ’য়ে এখন ডাক্তারি
পড়ছে । এই বারোটা বছর ছেলেটি তার মাকে দেখেনি । পূজোর ছুটিতে যদি আসে...’। আর বললেন না । দেখলাম, আপাত কঠিন মনের ডাক্তার নন্দীর চোখ জলে চিক চিক করছে ।
জিজ্ঞাসা করলাম
আপনি কি সেই ছেলেটারও মানসিক চিকিৎসা করেছিলেন ? ব’ললেন ‘না, তার তো চিকিৎসার
দরকার ছিল’না, চিকিৎসার দরকার ছল তার মা’র, বারো বছর ধরে আমি তারই চিকিৎসা করে চলেছি, ক্রমেই সে
স্বাভাবিকজীবনে ফিরে আসছে’ ।
‘আর সেই ছেলেটি’ ? আমি কৌতুহল চাপতে পারলাম না । ডাক্তার নন্দী
আমার মুখের দিকে তাকালেন, বললেন ‘সেই ছেলেটিই শুভ – শুভঙ্কর ,
একটু আগে তুমি যার বন্ধুর অভিনয় করলে ।
শুভঙ্কর আমারই ছেলে’ । এক
অদ্ভুত নিঃশব্দতা আমাকে আচ্ছন্ন ক’রলো । শুধু ডাক্তার বাবুর কথা শুনছি –‘আর যাকে তুমি শুভঙ্করের বন্ধু হ’য়ে প্রণাম ক’রলে সে শুভঙ্করেরই মা, ১২ বছর ধরে আমি যার
মনের জট খোলার চেষ্টা ক’রে চলেছি’ । আমি
কয়েক মিনিট কোন কথা ব’লতে পারলাম না । ডাক্তার বাবুর কথায় ঘোর কাটলো । ‘এবার তবে এসো, অনেকক্ষণ তোমাকে
আটকে রাখলাম’ । আমি উঠলাম, শুধু অস্ফূট স্বরে ব’ললাম ‘ ‘কাকিমা
সম্পূর্ণভালো হয়ে উঠবেন তো’ ?
ডাক্তার বাবু ব’ললেন ‘হ্যা, আশাতো করছি শুভ এসে
সম্পূর্ণ সুস্থ মাকে দেখতে পাবে । তবে –‘ ভারি হয়ে আসা কন্ঠে বললেন দুঃখ একটা থাকবে
যে ছেলেকে সে দেখতে পাবে না স্পর্শ ক’রতে পারবে মাত্র । মাঝে মাঝে এসো, শুভ বন্ধু হয়েই এস , তোমাকে স্পর্শ ক’রে হয়তো তোমার
কাকিমা আর একটু তাড়া তাড়ি ভালো হয়ে উঠবে । আর হ্যা,
নাটকটা লেখা হলে আমাকে পড়াবে’ । ‘আসবো, নিশ্চয় আসবো’ বলে রাস্তায়
বেরিয়ে পড়লাম ।
রাস্তায়
বেরিয়ে নিজেকে ব’ললাম – লিখবো, নাটকটা লিখবো । কিন্তু কাকে নিয়ে ?
সমাজের গভীরতর অসুখের বিরুদ্ধে ডাক্তার
নন্দীর নিঃশব্দ সংগ্রাম না কি সেই গভীর অসুখের মুখে লাথি মেরে নিজের সহপাঠীকে খুন
করা সেই ছেলেটির ডাক্তার শুভঙ্কর নন্দী হ’য়ে ওঠার কথা ?
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন